Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডক্রিকেটক্রিকেটে আসছে ১০ ঐতিহাসিক নতুন নিয়ম: এবার বৈধ ‘অবৈধ’ ব্যাট, বদলাচ্ছে চেনা...

ক্রিকেটে আসছে ১০ ঐতিহাসিক নতুন নিয়ম: এবার বৈধ ‘অবৈধ’ ব্যাট, বদলাচ্ছে চেনা ছবি

Share

ক্রিকেট এমন এক খেলা, যেখানে ছোট একটা নিয়ম বদলালেই পুরো ম্যাচের ছবি পাল্টে যেতে পারে। ঠিক তেমনই বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটল ক্রিকেট। মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব বা এমসিসি ক্রিকেটের নিয়মে একগুচ্ছ সংশোধনী এনেছে। মোট ৭৩টি পরিবর্তনের মধ্যে ১০টি নিয়মে বড়সড় বদল আনা হয়েছে। আগামী ১ অক্টোবর থেকে এই নতুন নিয়মগুলি কার্যকর হবে।

এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য খুব পরিষ্কার। ক্রিকেটকে আরও সহজ, আরও সস্তা এবং সাধারণ মানুষের কাছে আরও পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে অপেশাদার এবং ঘরোয়া ক্রিকেটারদের কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্তগুলি নেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়ম শুধু খেলোয়াড়দের নয়, আম্পায়ার, দর্শক এবং ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
চলুন সহজ করে বুঝে নেওয়া যাক, কী কী বদল আসছে এবং কেন এগুলো এত তাৎপর্যপূর্ণ।

ক্রিকেটের নিয়ম বদলের নেপথ্য কারণ

গত কয়েক বছরে ক্রিকেটের সরঞ্জামের দাম অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে ব্যাট। ভালো মানের ব্যাট কিনতে গেলে অনেক সময় সাধারণ পরিবারের পক্ষে সেটা সম্ভব হয় না। এর পাশাপাশি খেলায় কিছু নিয়ম এতটাই জটিল ছিল যে নতুন বা অপেশাদার খেলোয়াড়দের বুঝতে সমস্যা হতো।

এমসিসির লক্ষ্য ছিল খেলাটাকে সহজ করা। এমনভাবে নিয়ম বদলানো, যাতে খেলার মান নষ্ট না হয়, আবার খরচও কমে। সেই ভাবনা থেকেই এসেছে এই নতুন আইন।

ল্যামিনেটেড ব্যাট এখন বৈধ

সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনটি ব্যাট নিয়ে। এতদিন ল্যামিনেটেড ব্যাট, অর্থাৎ কয়েক স্তরের কাঠ দিয়ে তৈরি ব্যাট, শুধু জুনিয়র ক্রিকেটে ব্যবহার করা যেত। সিনিয়র বা অপেশাদার ক্রিকেটে এগুলো কার্যত নিষিদ্ধ ছিল।

নতুন নিয়মে সেই বাধা উঠে যাচ্ছে। এখন থেকে সব ধরনের অপেশাদার ক্রিকেটে ল্যামিনেটেড ব্যাট ব্যবহার করা যাবে। এর মানে ব্যাটের দাম অনেকটাই কমবে।
এমসিসির মতে, এই ব্যাট ব্যবহারে বলের গতি বা খেলার স্বাভাবিক চরিত্রে তেমন কোনও পরিবর্তন হবে না। বরং ইংলিশ উইলো কাঠের সংকট কমবে। ভাবুন তো, কম খরচে যদি একই রকম ক্রিকেট খেলা যায়, তাহলে খেলাটা কত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছবে।

দিনের শেষ ওভারে খেলা থামানোর নিয়ম বদল

আগে দেখা যেত দিনের শেষ ওভারে যদি উইকেট পড়ে যায়, তাহলে সেখানেই খেলা শেষ করে দেওয়া হতো। এতে অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি হতো।
নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, দিনের শেষ ওভার পুরো না হওয়া পর্যন্ত খেলা চলবে। মাঝখানে উইকেট পড়লেও আর খেলা থামবে না। এতে ম্যাচের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং অযথা বিতর্ক কমবে।

‘বানি হপ’ ক্যাচে কড়াকড়ি

বাউন্ডারির ধারে দাঁড়িয়ে লাফিয়ে ক্যাচ নেওয়া এখন অনেক বেশি কঠিন হবে। আগে ফিল্ডার বাউন্ডারির বাইরে থেকে লাফিয়ে এসে একাধিকবার বল স্পর্শ করতে পারতেন।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ফিল্ডার শূন্যে থাকা অবস্থায় একবারই বল ছুঁতে পারবেন। ক্যাচ সম্পূর্ণ করতে হলে তাকে অবশ্যই বাউন্ডারির ভেতরে থাকতে হবে। আইসিসি আগেই এই নিয়ম চালু করেছিল। এবার এমসিসির আইনে সেটাই পাকাপাকি জায়গা পেল।

উইকেটরক্ষকের দস্তানা নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশ

উইকেটরক্ষক কোথায় দস্তানা রাখবেন, সেটা নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। নতুন নিয়মে বিষয়টি পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে।
বোলার দৌড় শুরু করার সময় উইকেটরক্ষকের দস্তানা স্টাম্পের সামনে থাকতে পারে। কিন্তু বোলার বল ছাড়ার মুহূর্তে দস্তানা অবশ্যই স্টাম্পের পিছনে রাখতে হবে। এতে ব্যাটারদের জন্য পরিস্থিতি আরও ন্যায্য হবে।

ইচ্ছাকৃত শর্ট রানে কঠোর শাস্তি

ইচ্ছা করে শর্ট রান নেওয়া অনেক সময় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এতদিন এর শাস্তি ছিল পাঁচ রান জরিমানা।
নতুন নিয়মে আরও একটি কড়া শাস্তি যোগ হয়েছে। শর্ট রানের পর পরের বল কোন ব্যাটার খেলবেন, সেটা ঠিক করবে ফিল্ডিং করা দল। তবে ভুলবশত রান পূর্ণ না হলে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।

হিট উইকেট নিয়মে স্বচ্ছতা

ব্যাটার বল মারতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে নিজের স্টাম্পে পড়ে গেলে সেটাকে হিট উইকেট ধরা হবে। কিন্তু যদি কোনও ফিল্ডারের সঙ্গে ধাক্কা লেগে এমনটা হয়, তাহলে আর আউট হবেন না।

এছাড়া ব্যাট বা অন্য কোনও সরঞ্জাম যদি ফিল্ডার বা উইকেটরক্ষকের গায়ে লেগে স্টাম্পে পড়ে, তাতেও ব্যাটার আউট হবেন না। এই নিয়ম অনেক পুরনো বিতর্কের অবসান ঘটাবে।

‘ডেড বল’ ঘোষণায় আম্পায়ারের ভূমিকা বাড়ল

এতদিন বল বোলার বা উইকেটরক্ষকের হাতে গেলেই অনেক সময় ‘ডেড বল’ ধরা হতো। নতুন নিয়মে সেটা আর বাধ্যতামূলক নয়।
এখন কোনও ফিল্ডারের হাতে বল থাকলেও পরিস্থিতি দেখে আম্পায়ার ‘ডেড বল’ ঘোষণা করতে পারবেন। এতে খেলার বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে নিয়ম আরও ভালোভাবে মানিয়ে যাবে।

ওভার থ্রো নিয়ে পরিষ্কার সংজ্ঞা

এখন থেকে শুধু নির্দিষ্ট কারণে উইকেট লক্ষ্য করে বল ছোড়া হলে সেটাকে ওভার থ্রো বলা হবে। সাধারণ মিস ফিল্ডিং আর ওভার থ্রো হিসেবে ধরা হবে না। এতে অপ্রয়োজনীয় রান দেওয়া কমবে।

শেষ ইনিংসে ডিক্লেয়ার করা যাবে না

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ম্যাচের শেষ ইনিংসে কোনও অধিনায়ক আর ইনিংস ঘোষণা করতে পারবেন না। অর্থাৎ ডিক্লেয়ার নিষিদ্ধ। এতে ম্যাচের ফল আরও স্বাভাবিক পথে আসবে বলে মনে করছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা।

ক্রিকেটে লিঙ্গ নিরপেক্ষ ভাষা

ক্রিকেটের ভাষাতেও বদল আসছে। এখন থেকে পুরুষ বা নারীবাচক শব্দের বদলে লিঙ্গ নিরপেক্ষ শব্দ ব্যবহার করা হবে। যেমন ‘ব্যাটসম্যান’ নয়, সর্বত্র ব্যবহার হবে ‘ব্যাটার’। এই পরিবর্তন আধুনিক ক্রিকেটের মানসিকতার সঙ্গেই মানানসই।

শেষ কথা

এই নতুন নিয়মগুলো প্রথমে একটু অচেনা লাগতেই পারে। কিন্তু ভেবে দেখলে বোঝা যায়, এগুলোর লক্ষ্য ক্রিকেটকে আরও সহজ, আরও ন্যায্য এবং আরও মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা।

কম দামে ব্যাট, পরিষ্কার নিয়ম, কম বিতর্ক। সব মিলিয়ে ক্রিকেট যেন আবার তার শিকড়ে ফিরছে। মাঠে নামা নতুন ছেলেটা হোক বা পাড়ার ক্লাবের খেলোয়াড়, এই নিয়মগুলো তাদের জন্যই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগবে। ক্রিকেট বদলাচ্ছে, তবে খেলাটার প্রাণ ঠিকই থেকে যাচ্ছে।

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন