সোমবার কফি ডেট, মঙ্গলবার লং ড্রাইভ, বুধবার মুভি নাইট, বৃহস্পতিবার ক্যান্ডেল লাইট ডিনার। শুনতে যেন ব্যস্ত সোশ্যাল ক্যালেন্ডার। কিন্তু না, এটা কোনও ছুটির প্ল্যান নয়। এটাই হালফিলের নতুন প্রেমের ট্রেন্ড—‘রস্টার ডেটিং’। বিশেষ করে জেন জি-র মধ্যে এই প্রবণতা চোখে পড়ার মতো বাড়ছে। প্রশ্ন একটাই, এই ধরনের ডেটিং কি সত্যিই আধুনিক সম্পর্কের জন্য স্বাস্থ্যকর, নাকি ভবিষ্যতের জন্য লুকিয়ে আছে বড় ঝুঁকি?
সহজ ভাষায় বললে, রস্টার ডেটিং মানে একসঙ্গে একাধিক মানুষের সঙ্গে ডেট করা। তবে এখানে কোনও লুকোচুরি নেই। সবাই জানে, আপনি সিরিয়াস নন। আজ যাঁর সঙ্গে দেখা করছেন, তাঁর সঙ্গেই যে আগামীকালও করবেন, তার কোনও গ্যারান্টি নেই।
একজনের সঙ্গে নদীর ধারে হাঁটা, আরেকজনের সঙ্গে ছাদে ডিনার, আবার কারও সঙ্গে উইকএন্ডে সিনেমা। সম্পর্কটা পুরোপুরি ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’। ভালো লাগলে এগোবেন, না লাগলে সরে যাবেন। কোনও দায় নেই, কোনও চাপ নেই।
জেন জি-র ভাবনাচিন্তা আগের প্রজন্মের থেকে আলাদা। তাঁরা আর “লোকে কী বলবে” এই ভয় নিয়ে বসে থাকেন না। সম্পর্ক তাঁদের কাছে আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, বরং জীবনের আর পাঁচটা অভিজ্ঞতার মতোই একটা অধ্যায়।
আজকের তরুণরা নিজেদের অগ্রাধিকার পরিষ্কার জানে। কেরিয়ার, মানসিক শান্তি, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা—সবকিছুই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রেমেও তাঁরা চাইছেন স্পেস। রস্টার ডেটিং সেই স্পেসটাই দেয়।
একসময় সম্পর্কের ভারসাম্য ছিল অসম। পুরুষরা উপার্জন করতেন, মহিলারা অনেক সময় নির্ভরশীল থাকতেন। ফলে সম্পর্ক ভালো না লাগলেও মুখ খুলতে পারতেন না অনেকে।
আজ পরিস্থিতি বদলেছে। মহিলারা কেরিয়ার সচেতন, আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী। ফলে সঙ্গী বাছার ক্ষেত্রে তাঁরা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। “এটাই মেনে নাও” মানসিকতা আর কাজ করে না। পছন্দ না হলে সরে আসার সাহস এখন অনেকেরই আছে। রস্টার ডেটিং সেই স্বাধীনতারই এক রূপ।
বর্তমান সময়ে মানুষের উপর মানুষের আস্থা কমছে। প্রতারণা, ঘোস্টিং, কমিটমেন্ট ফোবিয়া—এই শব্দগুলো এখন ডেটিং জগতের নিত্যসঙ্গী। ফলে অনেকেই শুরু থেকেই ভাবেন, সম্পর্ক চিরস্থায়ী হবে না।
এই মানসিকতা থেকেই অনেকে এক জনের উপর সব আবেগ ঢেলে না দিয়ে, একাধিক মানুষের সঙ্গে আলাপ রাখছেন। এতে মন ভাঙার ঝুঁকি কম বলে মনে করেন তাঁরা।
এই ধরনের ডেটিংয়ের একটা বড় সুবিধা আছে। ভুল মানুষের প্রেমে পড়ার সম্ভাবনা কমে। এক জনের সঙ্গেই আটকে না থেকে, বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে সময় কাটালে নিজের পছন্দ-অপছন্দ পরিষ্কার হয়।
অনেকে মনে করেন, বিয়ের পর বিচ্ছেদের চেয়ে আগে এমনভাবে মানুষ চিনে নেওয়া অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। এতে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা কমে।
এখানেই আসে বড় প্রশ্ন। একাধিক মানুষের সঙ্গে ডেট করলে আবেগ জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকেই। সবাই সমানভাবে বিষয়টা হালকাভাবে নিতে পারে না। কেউ সিরিয়াস হয়ে পড়লে, অন্যজন না হলে সমস্যা তৈরি হয়।
আরও একটা দিক আছে। বারবার নতুন মানুষ, নতুন কথাবার্তা, নতুন শুরু—এতে মানসিক ক্লান্তি আসতে পারে। সম্পর্ক তখন আর স্বস্তির জায়গা না হয়ে, একটা প্রজেক্টের মতো মনে হতে শুরু করে।
জীবনের অনেক ক্ষেত্রে ট্রায়াল অ্যান্ড এরর কাজ করে। কিন্তু সম্পর্ক শুধু যুক্তির খেলা নয়, এখানে আবেগ জড়িত। তাই এই পদ্ধতি সবার জন্য উপযুক্ত নয়।
যাঁরা নিজেদের অনুভূতি স্পষ্টভাবে বোঝেন, সীমারেখা টানতে জানেন, তাঁদের জন্য রস্টার ডেটিং হয়তো কাজ করতে পারে। কিন্তু যাঁরা দ্রুত জড়িয়ে পড়েন, তাঁদের জন্য এটা কষ্টের কারণ হতে পারে।
রস্টার ডেটিং আসলে সময়েরই প্রতিফলন। দ্রুতগতির জীবন, বদলে যাওয়া মূল্যবোধ, আর ব্যক্তিস্বাধীনতার চাহিদা—সব মিলিয়েই এই ট্রেন্ড।
এটা হয়তো চিরস্থায়ী সমাধান নয়। কিন্তু এটা দেখিয়ে দিচ্ছে, সম্পর্ক নিয়ে ভাবনার ধরন বদলাচ্ছে। একটাই ফর্মুলা আর সবার জন্য কাজ করে না।
সাতদিনে সাত প্রেমিক শুনতে চমকপ্রদ হলেও, এর পেছনে আছে গভীর সামাজিক বদল। রস্টার ডেটিং ভালো না খারাপ, তার উত্তর এক কথায় দেওয়া যায় না। সবটাই নির্ভর করছে মানুষটার মানসিক প্রস্তুতি আর সততার উপর।
সম্পর্ক মানেই দায়িত্ব। সেটা এক জনের সঙ্গে হোক বা একাধিক মানুষের সঙ্গে, পরিষ্কার থাকা আর সম্মান দেখানোই আসল। ট্রেন্ড যাই হোক, শেষ পর্যন্ত মনটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

