বলিউডের সঙ্গীত জগতে যখন প্রতিযোগিতা তুঙ্গে, তখন একজন শিল্পী নিজের শীর্ষ সময়ে দাঁড়িয়ে হঠাৎ ‘অবসর’ শব্দটা উচ্চারণ করলে স্বাভাবিকভাবেই চমকে উঠতে হয়। ঠিক সেটাই করলেন অরিজিৎ সিং। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে, কেরিয়ারের মধ্যগগনে থাকা অবস্থায় তাঁর স্বেচ্ছাবসর ঘোষণায় গোটা সিনেপাড়া থমকে গিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি কেরিয়ার বিরতি নয়, বরং ভারতীয় প্লেব্যাক ইন্ডাস্ট্রির প্রচলিত ধারার বিরুদ্ধে এক নির্ভীক প্রতিবাদ।
অরিজিৎ সিং মানেই আবেগ, গভীরতা আর শ্রোতার মনের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বলিউডের প্রায় প্রতিটি বড় ছবিতে তাঁর কণ্ঠ শোনা গিয়েছে। প্রেমের গান হোক বা বিচ্ছেদের সুর, তাঁর গলায় সবকিছুই যেন জীবন্ত হয়ে উঠত। তাই তাঁকে ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ বলা হলে একটুও বাড়াবাড়ি হয় না।
কিন্তু এই রাজত্ব গড়ার পথটা ছিল নিঃশব্দ। প্রচার নয়, বিতর্ক নয়, শুধু কাজ। নিজের গানের মাধ্যমেই তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে গিয়েছেন। আর ঠিক সেই কারণেই তাঁর সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
অনেকে ভাবছেন, হঠাৎ কী এমন হলো যে অরিজিৎ সিং প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ালেন। কিন্তু ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, এই সিদ্ধান্ত একদিনের নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি অনুভব করছিলেন একঘেয়েমি। একই ধরনের গান, একই ধরনের চাহিদা, আর প্রযোজকদের নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে রাখার প্রবণতা তাঁকে ক্লান্ত করে তুলেছিল।
নিজের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন এই একঘেয়েমির কথা। একজন ভার্সেটাইল শিল্পীর জন্য এটা ঠিক যেন পায়ে শিকল বেঁধে দৌড়ানোর মতো। সৃষ্টিশীলতা যেখানে সবচেয়ে বড় শক্তি, সেখানে বারবার একই পথে হাঁটা তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
অরিজিৎ সিং বরাবরই স্পষ্টভাষী। একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি খোলাখুলিই বলেছেন, শিল্পীদের আবেগকে ব্যবহার করে কীভাবে পারিশ্রমিক কমানো হয়। তাঁর সেই বিখ্যাত মন্তব্য, “হয় কাজের ন্যায্য দাম দিন, নইলে কাজ করাবেন না”—আজও অনেকের মনে গেঁথে আছে।
এই সোজাসাপটা মনোভাবের জন্য তিনি অনেক সময় বিরাগভাজনও হয়েছেন। শোনা যায়, সম্প্রতি এক নামী মিউজিক প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ চরমে পৌঁছেছিল। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও তিনি ভয় না পেয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন।
মুম্বইয়ের গ্ল্যামার থেকে দূরে, নিজের মাটিতে জিয়াগঞ্জে আলাদা রাজত্ব গড়ে তুলেছেন অরিজিৎ। শিবতলা ঘাটের কাছে তাঁর বাড়িতে কখনও এড শিরান, কখনও মার্টিন গ্যারিক্সের মতো আন্তর্জাতিক শিল্পীদের আনাগোনা হয়েছে। এটা প্রমাণ করে, প্লেব্যাক ইন্ডাস্ট্রি তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়।
ভারতের ১৪০ কোটির মানুষের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর অনুরাগী ছড়িয়ে আছেন সারা বিশ্বে। তাই প্রযোজকদের কাছে তিনি ‘একমাত্র অপশন’ হলেও, তাঁর কাছে প্লেব্যাক ইন্ডাস্ট্রি কখনওই একমাত্র রাস্তা ছিল না।
স্বেচ্ছাবসর মানে কাজ থামিয়ে দেওয়া নয়। বরং অরিজিৎ নিজেই জানিয়েছেন, আগাম প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চলতি বছরে কিছু প্লেব্যাক কাজ তিনি শেষ করবেন। তবে এরপর আর নতুন কোনও অ্যাসাইনমেন্ট নেবেন না।
সবচেয়ে বড় খবর, তিনি এবার পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছেন। গত বছর বীরভূমে তাঁর পরিচালিত ছবির শুটিং হয়েছে। অভিনয়ে রয়েছেন নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকির কন্যা শোরা এবং দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য। খুব শিগগিরই সেই ছবি মুক্তির পথে।
এছাড়াও বিদেশে শুটিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। এতদিন নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে ব্যস্ততার কারণে যেসব কাজ এগোয়নি, এবার সেগুলিতেই মন দিতে চান তিনি।
ভক্তদের কাছে এই সিদ্ধান্ত কষ্টের হলেও, গর্বের। তাঁদের কথায়, “ফিনিক্স পাখি আবার নতুন করে জন্ম নিচ্ছে।” তাঁরা জানেন, অরিজিৎ মানেই কিছু আলাদা, কিছু সাহসী। একটু বিরতি নিয়ে, নিজের মতো করে ফিরে আসাই তাঁর স্টাইল।
সবুরে মেওয়া ফলে—এই প্রবাদটাই এখন ভক্তদের ভরসা। তাঁরা অপেক্ষা করছেন সেই ‘ম্যাজিক্যাল মেওয়া’র জন্য, যা হয়তো নতুন সুরে, নতুন ছবিতে, বা একেবারে নতুন রূপে ধরা দেবে।
অরিজিৎ সিং আবারও প্রমাণ করলেন, তিনি শুধু একজন গায়ক নন, তিনি একটি ভাবনা। নিজের শীর্ষ সময়ে দাঁড়িয়ে সিংহাসন ছেড়ে দেওয়া সহজ নয়। কিন্তু তিনি সেটাই করলেন, মাথা উঁচু করে। এই স্বেচ্ছাবসর আসলে শেষ নয়, বরং আরও বড় কিছু শুরু হওয়ার ইঙ্গিত।
বলিউডের সঙ্গীত জগৎ আপাতত শূন্যতায় ভুগলেও, সবাই জানে—অরিজিৎ সিং মানেই ফিরে আসা। নতুন রূপে, নতুন গল্পে, আরও শক্তভাবে।

