Homeইতিহাস-ঐতিহ্যচন্দ্রশেখর বসু: ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে দুর্ভিক্ষ-দগ্ধ বাংলার মানবিক লড়াই

চন্দ্রশেখর বসু: ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে দুর্ভিক্ষ-দগ্ধ বাংলার মানবিক লড়াই

অভিজ্ঞতার আলো-আঁধারিই তাঁকে করে তুলেছিল এক মানবিক ও সংগ্রামী মানুষ, যার জীবন আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে।

Share

বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে চন্দ্রশেখর বসুর নাম এক বিশেষ জায়গা জুড়ে আছে। তাঁর কৈশোর, তারুণ্য ও ছাত্রজীবন কেবল ব্যক্তিগত বেড়ে ওঠার গল্প নয়, বরং তা ব্রিটিশ শাসনামলের বাংলার এক দীর্ঘ সংগ্রামী সময়ের প্রতিচ্ছবি। কৃষক আন্দোলন, অস্পৃশ্যতাবিরোধী উদ্যোগ, ছাত্ররাজনীতি ও বামপন্থী চেতনা—এই সবকিছু মিলিয়েই গড়ে উঠেছিল তাঁর চিন্তার জগৎ।

চন্দ্রশেখর বসুর শৈশব কেটেছে পাঁজিয়া গ্রামে। এই গ্রাম তখন নিছক গ্রাম ছিল না, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণের এক জীবন্ত কেন্দ্র। তাঁর স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসে সুশীলবাবু ও অনিলা দেবীর নাম। তাঁদের নেতৃত্বেই পাঁজিয়ায় শুরু হয়েছিল সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ‘সারস্বত পরিষদ’ গড়ে তুলে একটি বড় চালাঘরে নাটক, আলোচনা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘চারুচন্দ্র পাঠাগার’। এই পাঠাগার খুব দ্রুত গ্রামের তরুণদের চিন্তার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

এই পরিবেশেই ধীরে ধীরে চন্দ্রশেখর বসুর মনে রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ জন্মায়। বই পড়া, আলোচনা শোনা আর মানুষের সঙ্গে মিশে তিনি বুঝতে শেখেন সমাজ বদলানোর মানে কী।

১৯২১ সালে গান্ধিজির অসহযোগ আন্দোলনের ডাক পাঁজিয়াতেও আলোড়ন তোলে। সুশীলবাবু কলেজ ছেড়ে সরাসরি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত গ্রামের মানুষকে সাহস জোগায়। পরে সুশীলবাবু ও অনিলা দেবীর নেতৃত্বে শুরু হয় কৃষক আন্দোলন। জমিদারপ্রধান গ্রামে কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিয়ে কথা বলা সহজ ছিল না। তবু তাঁরা পিছিয়ে যাননি।

গান্ধিজির অস্পৃশ্যতাবিরোধী আন্দোলনের প্রভাবে পাঁজিয়ায় আয়োজন করা হয় সার্বজনীন ভোজ। সবাই এক সারিতে বসে খাওয়ার এই উদ্যোগ সমাজে বড় আলোড়ন তোলে। প্রথমে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন, কিন্তু ধীরে ধীরে গ্রামের ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ পরিবারগুলিও এতে অংশ নেয়। এই সাফল্য জমিদারদের অস্বস্তিতে ফেলে।

সার্বজনীন ভোজ আর কৃষক আন্দোলনের ফলে জমিদারদের আশঙ্কা বাড়তে থাকে। তাঁদের মনে হয়, নিম্নবর্গের মানুষ যদি মাথা তুলে দাঁড়ায়, তবে নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হবে। কেউ কেউ এটিকে সনাতন ধর্মের জন্য হুমকি বলেও প্রচার করে। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

শেষ পর্যন্ত একদিন জমিদারের লোকেরা ‘সারস্বত পরিষদ’-এর চালাঘর ও পাঠাগারে আগুন ধরিয়ে দেয়। পাঁজিয়ার সাংস্কৃতিক জাগরণে এটি ছিল এক গভীর আঘাত। এই ঘটনার সাক্ষী হয়ে বড় হয়েছেন চন্দ্রশেখর বসু, যা তাঁর মনে প্রতিবাদী মনোভাব আরও দৃঢ় করে।

স্কুলজীবন থেকেই চন্দ্রশেখর বসুর ঝোঁক ছিল খবরের কাগজ ও পত্রিকা পড়ার দিকে। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের লেখা তিনি আগ্রহ নিয়ে পড়তেন। সুশীলবাবুর সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, ছোটখাটো কাজ করা—এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে তাঁর বামপন্থী চিন্তার সঙ্গে পরিচয় ঘটে।

১৯৩৮ সালে, দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন, স্কুলের সরস্বতী পুজোর দায়িত্ব পান তিনি ও তাঁর বন্ধুরা। পুজোর খরচ মিটিয়ে বেঁচে যাওয়া বারো আনা দিয়ে তাঁরা তৈরি করেন একটি পতাকা। সাদা কাপড়ে লাল বর্ডার, লাল অক্ষরে লেখা ছিল “ফ্রিডম, পিস, প্রগ্রেস!”। এই পতাকাই পরে ছাত্র ফেডারেশনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

একই বছরে খুলনায় অল ইন্ডিয়া ছাত্র ফেডারেশনের অধিবেশনে সাইকেলে চেপে যোগ দেন চন্দ্রশেখর বসু ও বিমল ঘোষ। সেই অভিজ্ঞতা তাঁদের ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করে।

যশোরে কলেজ প্রতিষ্ঠার পর ছাত্র ফেডারেশন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তবে এর পাল্টা হিসেবে মুসলিম লীগও একটি ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলে। দুই পক্ষের মধ্যে প্রায়ই মতবিরোধ ও উত্তেজনা দেখা দিত। কলেজ ম্যাগাজিন ‘উদয়ন’-এর সম্পাদক হিসেবে চন্দ্রশেখর বসু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চাপ খুব কাছ থেকে অনুভব করেন। একটি পদ্মফুলের ছবি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, যা তখনকার সময়ের রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট করে।

১৯৪২ সালে কমিউনিস্ট পার্টি আইনি স্বীকৃতি পেলে চন্দ্রশেখর বসু যশোর পার্টি অফিসে নিয়মিত বসতে শুরু করেন। তখনও তিনি আনুষ্ঠানিক সদস্য ছিলেন না, কিন্তু কাজের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। কংগ্রেসপন্থীদের আক্রমণ বাড়তে থাকায় আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

একদিন পার্টি অফিসে হামলা হলে একা প্রতিরোধ করেন বিমল ঘোষ। তিনি মারাত্মক আহত হন। এই ঘটনা চন্দ্রশেখর বসুর মনে রাজনৈতিক সংগ্রামের কঠিন বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করে তোলে।

১৯৪৩ সাল ছিল বাংলার ইতিহাসে এক ভয়াবহ বছর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দুর্ভিক্ষ গ্রাস করে গ্রামবাংলাকে। সেই বছর ফার্স্ট ডিভিশনে আইএ পাস করে চন্দ্রশেখর বসু কলকাতায় আসেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি যুক্ত হন বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভার কাজে।

কলকাতার বউবাজার স্ট্রীটের অফিসে বসেই তিনি প্রতিদিন গ্রাম থেকে আসা ভয়াবহ খবর শুনতেন। তেভাগা আন্দোলনে পুলিশের লাঠিচার্জ, গুলি আর আহত কৃষকদের আর্তনাদ তাঁর চোখ খুলে দেয়।

দুর্ভিক্ষে গ্রাম থেকে অসংখ্য মানুষ কলকাতায় আশ্রয় নেয়। রাস্তায় রাস্তায় শোনা যেত “ফ্যান দাও” আর্তনাদ। এই সময় গড়ে ওঠে ‘জনরক্ষা সমিতি’। লঙ্গরখানায় খাবার পরিবেশন ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে জরুরি কাজ।

চন্দ্রশেখর বসুও এই কাজে যুক্ত হন। ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাঁর কাছে তখন রাজনীতির চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আজীবনের জন্য মানবিক করে তোলে।

দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতা জায়গা করে নেয় সাহিত্য ও নাটকে। বিজন ভট্টাচার্যের ‘জবানবন্দী’ ও পরে ‘নবান্ন’ সেই সময়ের বাস্তবতার দলিল। ৪৬ ধর্মতলা স্ট্রীট ছিল প্রগতিশীল লেখক ও শিল্পীদের মিলনকেন্দ্র।

সেই পরিবেশে চন্দ্রশেখর বসু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, রজনী পাল্ম দত্তদের মতো মানুষদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পান। এই সবকিছু মিলেই তাঁর চিন্তার ভিত শক্ত হয়।

চন্দ্রশেখর বসুর জীবন কেবল রাজনৈতিক কর্মীর গল্প নয়। এটি বাংলার সামাজিক রূপান্তরের ইতিহাস। পাঁজিয়ার জ্বলে যাওয়া চালাঘর থেকে কলকাতার দুর্ভিক্ষপীড়িত রাস্তা—এই পথচলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আন্দোলন মানে শুধু স্লোগান নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোও। তাঁর অভিজ্ঞতার আলো-আঁধারিই তাঁকে করে তুলেছিল এক মানবিক ও সংগ্রামী মানুষ, যার জীবন আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে।

লেখক: সাজেদ বকুল, সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক।

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন