পর্তুগালের ফুটবল আইকন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। যাঁর নাম মানেই সাফল্য, গৌরব আর অগণিত ভক্তের আবেগ। সেই রোনাল্ডোর সম্মানই এবার ক্ষুণ্ণ হল তাঁর নিজের শহরে। মাদেইরা দ্বীপে স্থাপিত রোনাল্ডোর মূর্তিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিশ্ব ফুটবলে নেমে এসেছে তীব্র আলোড়ন। শুধু ভাঙচুর নয়, প্রকাশ্যে ভিডিও করে সেই আগুন লাগানোর দৃশ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। ফলে বিষয়টি আরও বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মাদেইরা দ্বীপের রাজধানী ফুনশাল। এই শহরেই রয়েছে ‘সিআর৭ মিউজিয়াম’। তার সামনেই ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর ভাস্কর্য। ২০১৪ সালে রোনাল্ডো নিজে সপরিবারে এসে এই মূর্তির উদ্বোধন করেছিলেন। পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী তারকার জীবনের স্মৃতি আর সাফল্যকে সম্মান জানাতেই এই ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছিল।
এই মূর্তিটি শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়। এটি পর্তুগালের মানুষের আবেগ, গর্ব আর ফুটবল ইতিহাসের অংশ। পর্যটকেরা এখানে এসে ছবি তোলেন, ভক্তরা শ্রদ্ধা জানান। সেই প্রতীকেই এবার আগুন লাগানো হল।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এক যুবক রাতের অন্ধকারে মূর্তিটির কাছে আসে। প্রথমে সে মূর্তির গায়ে দাহ্য তরল ঢালে। তারপর লাইটার জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই পুরো ঘটনার ভিডিও সে নিজেই রেকর্ড করে। শুধু তাই নয়, সেই ভিডিও সে নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পোস্ট করে দেয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, আগুন জ্বালানোর পর যুবক কিছুটা দূরে গিয়ে উচ্চস্বরে র্যাপ গান বাজাতে শুরু করে। এরপর সে অদ্ভুত ভঙ্গিতে নাচতে থাকে এবং উন্মত্ত উদযাপনে মেতে ওঠে। দৃশ্যটি দেখে অনেকেই বিস্মিত, আবার অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
ভিডিওর সঙ্গে ওই যুবক একটি রহস্যময় বার্তাও জুড়ে দেয়। সেখানে লেখা ছিল, “ঈশ্বরের শেষ সতর্কবার্তা।” এই মন্তব্য ঘিরেই বিতর্ক আরও বেড়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, কেন এমন সহিংস কাজের সঙ্গে ধর্মীয় বার্তা জুড়ে দেওয়া হল।
ওই যুবকের সোশাল মিডিয়া প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা গেছে, সে নিজেকে “মানুষ, ফ্রিস্টাইলার ও স্থানীয় বাসিন্দা” হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। তার প্রায় হাজারখানেক অনুসারী রয়েছে। অনেকে মনে করছেন, সোশাল মিডিয়ায় আলোচনায় আসার জন্যই সে এমন চরম কাজ করেছে।
ফুনশালের পাবলিক সিকিউরিটি পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত যুবককে শনাক্ত করা হয়েছে। যদিও ঘটনার পরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। পুলিশ আরও জানায়, ওই ব্যক্তি নতুন কেউ নয়। এর আগেও সে একই ধরনের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
পুলিশ বর্তমানে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান শুরু করেছে। মূর্তিটি পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। আগুনের স্ফুলিঙ্গ প্রথমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তা নিভে যায়।
এই ঘটনার পর রোনাল্ডোর ভক্তদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক প্রতিবাদী মন্তব্য দেখা যাচ্ছে। কেউ লিখেছেন, “শুধু লাইক আর ফলোয়ারের জন্য এমন কাজ মেনে নেওয়া যায় না।” আরেকজনের মন্তব্য, “তুমি সব সীমা ছাড়িয়ে গেছ। ঈশ্বরের নাম ব্যবহার করে এমন কাণ্ড লজ্জাজনক।”
অনেকেই ওই যুবকের মানসিক অবস্থার প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ সরাসরি বলেছেন, তার মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন। ফুটবলপ্রেমীদের মতে, একজন খেলোয়াড়ের প্রতি ভালোবাসা না থাকলেও এমন অপমানজনক আচরণ কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সিআর৭ মিউজিয়ামের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিষয়টি এখন পুরোপুরি পুলিশের হাতে। এই মুহূর্তে তারা কোনও মন্তব্য করতে চান না। প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দিকেই তারা তাকিয়ে আছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই মূর্তিটি আগেও বিতর্কে জড়িয়েছিল। ২০১৬ সালে একদল উগ্র সমর্থক মূর্তিটিতে ভাঙচুর চালায়। তখন নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে সেটিকে আগের জায়গা থেকে সরিয়ে বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো শুধু একজন ফুটবলার নন। তিনি একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড। তাঁর জনপ্রিয়তা যেমন আকাশছোঁয়া, তেমনি তাঁকে ঘিরে বিতর্কও কম নয়। মূর্তি, ভাস্কর্য বা প্রতিকৃতি অনেক সময়ই সমালোচনার মুখে পড়ে। কখনও শিল্পরূপ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, কখনও আবার ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়।
তবে মূর্তিতে আগুন লাগানোর মতো ঘটনা খুবই বিরল এবং চরম। এটি শুধু একজন খেলোয়াড়কে অপমান নয়, একটি শহর ও দেশের সম্মানকেও আঘাত করে।
এই ঘটনা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে। ফুটবলবিশ্বে রোনাল্ডোর অবস্থান এমন যে, তাঁর সঙ্গে জড়িত কোনও ঘটনা সহজে চাপা পড়ে না। অনেকেই বলছেন, সোশাল মিডিয়ার যুগে এই ধরনের উসকানিমূলক কাজ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভুল বার্তা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এই ধরনের স্মৃতিস্তম্ভের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা দরকার। কারণ এগুলো শুধু পাথর বা ধাতু নয়, মানুষের আবেগের প্রতীক।
নিজ শহর মাদেইরায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর মূর্তিতে আগুন লাগানোর ঘটনা ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এটি একদিকে যেমন সামাজিক অবক্ষয়ের ছবি দেখায়, তেমনি সোশাল মিডিয়ার নেতিবাচক ব্যবহারের দিকটিও সামনে আনে। পুলিশি তদন্তের দিকে এখন সকলের নজর। সবাই অপেক্ষা করছে, এই ঘটনার দায়ীদের কী শাস্তি হয় এবং ভবিষ্যতে এমন অপমানজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

