একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কঠিন। আর সেই প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রেখে অর্ধশত বছর পূর্ণ করা আরও কঠিন। কিন্তু যশোরের কৃতি সন্তান আজাদুল কবির আরজু প্রমাণ করেছেন, সৎ উদ্দেশ্য আর মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা থাকলে অসম্ভব বলে কিছু থাকে না। ১৯৭৬ সালে একটি ছোট স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করা জাগরণী ফাউন্ডেশন আজ ৫০ বছরের পথচলা পেরিয়ে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রভাবশালী সামাজিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
এই সুবর্ণ জয়ন্তী শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্মদিন নয়। এটি মানবিক উন্নয়ন, আত্মনির্ভরতা আর সামাজিক দায়বদ্ধতার এক জীবন্ত ইতিহাস।
ছোট স্বপ্ন থেকে বড় যাত্রার শুরু
আজ থেকে প্রায় পাঁচ দশক আগে, যখন গ্রামীণ বাংলাদেশে উন্নয়নের সুযোগ ছিল সীমিত, তখন আজাদুল কবির আরজু বিশ্বাস করেছিলেন মানুষের সম্ভাবনায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সঠিক সহায়তা পেলে সাধারণ মানুষই পারে নিজের জীবন বদলাতে। সেই বিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় জাগরণী ফাউন্ডেশন।
শুরুটা ছিল খুব সাধারণ। অল্প জনবল, সীমিত সম্পদ, কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি। ধীরে ধীরে এই প্রতিষ্ঠান মানুষের আস্থা অর্জন করে। এক গ্রামের মানুষ আরেক গ্রামে জাগরণীর গল্প শোনাতে থাকে। এভাবেই ছোট উদ্যোগটি বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে।
জাগরণী ফাউন্ডেশন আজ কী
আজ জাগরণী ফাউন্ডেশন মানেই শুধু একটি এনজিও নয়। এটি প্রায় ৮ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের জায়গা। এটি দেশের ৫১টি জেলায় বিস্তৃত একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। বর্তমানে জাগরণীর রয়েছে ৬৮০টি শাখা, যেখানে প্রতিদিন কাজ হচ্ছে মানুষের জীবন বদলানোর লক্ষ্যে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫ লাখ উদ্যোক্তার পাশে দাঁড়িয়েছে। কেউ পেয়েছেন ঋণ সহায়তা, কেউ পেয়েছেন প্রশিক্ষণ, আবার কেউ পেয়েছেন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস। জাগরণী ফাউন্ডেশন তাই অনেকের কাছে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ভরসার নাম।
মানবিক উন্নয়ন ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অনন্য দৃষ্টান্ত
জাগরণী ফাউন্ডেশনের কাজ শুধু আর্থিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ক্ষমতায়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন—সব ক্ষেত্রেই তাদের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। গ্রাম থেকে শহর, দরিদ্র থেকে প্রান্তিক—সব শ্রেণির মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান।
অনেক পরিবার আজ স্বাবলম্বী হয়েছে জাগরণীর সহায়তায়। অনেক নারী পেয়েছেন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ। অনেক তরুণ খুঁজে পেয়েছেন নতুন জীবনের দিশা। এই কারণেই জাগরণী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়ন খাতে একটি আলাদা অবস্থান তৈরি করেছে।
নেতৃত্বের শক্ত উদাহরণ: আজাদুল কবির আরজু
একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকে নেতৃত্বের। আজাদুল কবির আরজু সেই নেতৃত্বের জীবন্ত উদাহরণ। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পরও তিনি জাগরণী ফাউন্ডেশনের সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানে সারাদিন উপস্থিত ছিলেন। এটি তাঁর মানসিক দৃঢ়তা আর দায়িত্ববোধের স্পষ্ট প্রমাণ।
অনেকেই হয়তো বিশ্রাম নিতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন মানুষের পাশে থাকার পথ। এই মনোভাবই তাঁকে একজন সফল সংগঠক থেকে অনুপ্রেরণার প্রতীকে পরিণত করেছে।
‘জাগরিত মুখ’ ক্রেস্ট: সম্মান ও অনুপ্রেরণার প্রতীক
সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানে আজাদুল কবির আরজুর হাত থেকে ‘জাগরিত মুখ’ ক্রেস্ট গ্রহণ করা নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। এই সম্মান শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি জাগরণী ফাউন্ডেশনের আদর্শের স্বীকৃতি।
এই ধরনের সম্মান মানুষকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলে। নতুনভাবে কাজ করার শক্তি দেয়। ভবিষ্যতে সমাজের জন্য আরও ভালো কিছু করার অনুপ্রেরণা জোগায়।
৫০ বছরের পথচলা: একটি জীবন্ত ইতিহাস
জাগরণী ফাউন্ডেশনের ৫০ বছরের যাত্রা সহজ ছিল না। পথে এসেছে নানা বাধা, চ্যালেঞ্জ আর সংকট। কিন্তু প্রতিবারই প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে মানুষের আস্থা আর নেতৃত্বের দৃঢ়তায়।
এই দীর্ঘ পথচলা প্রমাণ করে, উন্নয়ন কাজ একদিনে হয় না। ধৈর্য লাগে, সময় লাগে, আর সবচেয়ে বেশি লাগে মানুষের প্রতি ভালোবাসা। জাগরণী ফাউন্ডেশন সেই ভালোবাসারই বাস্তব উদাহরণ।
ভবিষ্যতের পথে জাগরণী ফাউন্ডেশন
৫০ বছর পেরিয়ে জাগরণী ফাউন্ডেশন এখন আরও বড় স্বপ্ন দেখছে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন, তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি—এসব নিয়ে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।
আজাদুল কবির আরজুর প্রতি সবার একটাই প্রার্থনা, তিনি যেন সুস্থ থাকেন। যেন এই আলোকিত পথচলার আরও অনেক মাইলফলকের সাক্ষী হতে পারেন। তাঁর অভিজ্ঞতা আর দিকনির্দেশনা জাগরণী ফাউন্ডেশনকে সামনে এগিয়ে যেতে আরও শক্তি জোগাবে।
লেখক:সাজেদ রহমান,সম্পাদক ও প্রকাশক,যশোর খবর।

