মহাকাশপ্রেমী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও সাধারণ কৌতূহলী মানুষের জন্য ২০২৬ সাল হতে চলেছে এক স্মরণীয় বছর। নতুন বছরের ক্যালেন্ডারেই লুকিয়ে রয়েছে একের পর এক মহাজাগতিক চমক। সূর্য ও চাঁদের অবস্থানগত পরিবর্তনের ফলে ২০২৬ সালে মোট চারটি গ্রহণের সাক্ষী হতে চলেছে পৃথিবী। এর মধ্যে দুটি সূর্যগ্রহণ এবং দুটি চন্দ্রগ্রহণ। তবে এই বিরল চতুষ্টয়ের সব ক’টি গ্রহণ একযোগে দেখার সৌভাগ্য ভারতবাসীর হবে না।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, চারটি গ্রহণের মধ্যে মাত্র একটি গ্রহণই ভারতের আকাশ থেকে স্পষ্টভাবে দেখা যাবে। বাকি তিনটি হয় পুরোপুরি অদৃশ্য থাকবে, নয়তো আংশিকভাবে দৃশ্যমান হলেও তা বিশেষ চোখে পড়ার মতো হবে না। তবুও এই চারটি গ্রহণ মিলিয়ে ২০২৬ সালকে মহাকাশ চর্চার ইতিহাসে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
২০২৬: মহাকাশ চর্চায় কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
প্রতি বছরই পৃথিবী সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের সাক্ষী হয়। কিন্তু একই বছরে চারটি গ্রহণ—তার মধ্যে দুটি সূর্যগ্রহণ ও দুটি চন্দ্রগ্রহণ—এমন ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল। বিশেষ করে একটি পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ, যা আবার ‘ব্লাড মুন’ নামে পরিচিত, ভারত থেকে স্পষ্টভাবে দেখা যাবে—এটি ২০২৬ সালকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এই গ্রহণগুলি কেবল আকাশের সৌন্দর্য দেখার বিষয় নয়। সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবীর গতিবিধি, বায়ুমণ্ডলের প্রভাব, আলো বিচ্ছুরণের মতো নানা গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ এনে দেয় এই ঘটনাগুলি।
বছরের প্রথম চমক: বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ
২০২৬ সালের প্রথম মহাজাগতিক ঘটনা ঘটতে চলেছে ১৭ ফেব্রুয়ারি। এদিন দেখা যাবে একটি বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ। এই ধরনের গ্রহণকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘অ্যানুলার সোলার ইক্লিপ্স’, আর সাধারণভাবে একে ডাকা হয় ‘রিং অফ ফায়ার’।
এই গ্রহণের সময় চাঁদ সূর্যের সামনে এসে দাঁড়ালেও সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলতে পারে না। ফলে সূর্যের চারপাশে আগুনের বলয়ের মতো একটি উজ্জ্বল রিং দেখা যায়। ১৭ ফেব্রুয়ারির এই গ্রহণে সূর্যের প্রায় ৯৬ শতাংশ ঢেকে যাবে চাঁদের ছায়ায়। প্রায় ২ মিনিট ২০ সেকেন্ড ধরে স্থায়ী হবে এই অপূর্ব দৃশ্য।
তবে দুঃখের বিষয়, ভারতের আকাশ থেকে এই ‘রিং অফ ফায়ার’ দেখা যাবে না। দক্ষিণ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনা এবং অ্যান্টার্কটিকার কিছু অংশ থেকে এই বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হবে। ভারতবাসীকে তাই এই মহাজাগতিক দৃশ্য উপভোগ করতে হবে ছবি বা লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে।
ভারতবাসীর জন্য বড় খবর: পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ও ‘ব্লাড মুন’
সব আক্ষেপ ঘুচবে ৩ মার্চ। এদিন ভারতের আকাশে দেখা যাবে ২০২৬ সালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং একমাত্র স্পষ্ট দৃশ্যমান গ্রহণ—একটি পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ।
এই চন্দ্রগ্রহণের সময় পৃথিবীর ছায়া পুরোপুরি চাঁদকে ঢেকে ফেলবে। প্রায় ৫৮ মিনিট ধরে চলবে পূর্ণগ্রাস পর্ব। এই সময় চাঁদ উজ্জ্বল লালচে রঙ ধারণ করবে, যাকে বলা হয় ‘ব্লাড মুন’।
কেন লাল হয় চাঁদ? ব্লাড মুনের বিজ্ঞান
পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ লাল দেখানোর পেছনে রয়েছে এক চমৎকার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। সূর্যের আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে যাওয়ার সময় নীল আলো ছড়িয়ে পড়ে, আর লাল রঙের আলো বেঁকে গিয়ে চাঁদের গায়ে পড়ে। ফলে চাঁদ রক্তিম বা তামাটে লাল রঙ ধারণ করে।
এই দৃশ্য একদিকে যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনই বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব, ধূলিকণা ও আলো বিচ্ছুরণের ধরন বোঝার ক্ষেত্রে এই ধরনের গ্রহণ বিশেষ ভূমিকা নেয়।
২০২৯ সালের আগে শেষ পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ
এই ‘ব্লাড মুন’ আরও একটি কারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, ২০২৬ সালের ৩ মার্চের এই পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের পর ২০২৯ সালের আগে আর কোনও পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ পৃথিবী থেকে দেখা যাবে না।
ফলে যারা আকাশের এই বিরল দৃশ্য নিজের চোখে দেখার সুযোগ নিতে চান, তাঁদের জন্য এটি হতে চলেছে দীর্ঘ অপেক্ষার আগে শেষ বড় সুযোগ।
সুতক ও ধর্মীয় গুরুত্ব
ভারতে চন্দ্রগ্রহণ মানেই শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাসও। যেহেতু এই পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ভারত থেকে দৃশ্যমান হবে, তাই সুতক কালও মানা হবে।
অনেক পরিবারে এই সময় রান্না বন্ধ রাখা, দেবদেবীর পূজা স্থগিত রাখা এবং গ্রহণ শেষে স্নান করার মতো রীতি পালন করা হয়। যদিও বিজ্ঞান এই বিষয়গুলোকে কুসংস্কার হিসেবে দেখে, তবুও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
বাকি দুই গ্রহণ: ভারতের আকাশে প্রায় অদৃশ্য
২০২৬ সালের বাকি দুটি গ্রহণ—একটি সূর্যগ্রহণ ও একটি চন্দ্রগ্রহণ—ভারত থেকে দেখা যাবে না বা খুব সামান্য দৃশ্যমান হবে। তাই সেগুলি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম।
তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এই গ্রহণগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দেশের গবেষকরা আধুনিক টেলিস্কোপ ও উপগ্রহের সাহায্যে এই গ্রহণগুলোর তথ্য সংগ্রহ করবেন।
বিজ্ঞানীদের কাছে কেন এত মূল্যবান এই গ্রহণগুলি
মহাকাশ গবেষকদের মতে, গ্রহণ মানেই গবেষণার নতুন দরজা। সূর্যের করোনা, চাঁদের কক্ষপথ, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের আচরণ—সবকিছুই গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা যায় এই সময়।
বিশেষ করে সূর্যগ্রহণের সময় সূর্যের বাইরের স্তর বা করোনা পর্যবেক্ষণের সুযোগ মেলে, যা সাধারণ দিনে সম্ভব নয়। অন্যদিকে চন্দ্রগ্রহণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল নিয়ে গবেষণার এক অনন্য ক্ষেত্র তৈরি করে।
সাধারণ মানুষের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা
বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছেও গ্রহণ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। খালি চোখে আকাশের এই নাটকীয় পরিবর্তন দেখা জীবনে একবার হলেও মনে গেঁথে থাকার মতো ঘটনা।
২০২৬ সালের ৩ মার্চ, যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে, তাহলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ লাল রঙের চাঁদের মায়াবী রূপ দেখতে পাবেন। এই দৃশ্য শুধু চোখে নয়, ক্যামেরা আর স্মৃতিতেও বন্দি হবে।
শেষ কথা:
চারটি গ্রহণ, তার মধ্যে এক বিরল ‘ব্লাড মুন’—সব মিলিয়ে মহাকাশ চর্চার দুনিয়ায় ২০২৬ সাল হতে চলেছে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। যদিও সব গ্রহণ ভারতের আকাশ থেকে দেখা যাবে না, তবুও একমাত্র পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণই ভারতবাসীর কৌতূহলের কেন্দ্রে থাকবে।
বিজ্ঞান, ধর্ম ও সৌন্দর্য—এই তিনয়ের মেলবন্ধনে ২০২৬ সালের গ্রহণগুলি শুধু একটি মহাজাগতিক ঘটনা নয়, বরং মানুষের আকাশমুখী কৌতূহলকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই মহাকাশপ্রেমীদের ক্যালেন্ডারে এখন থেকেই চিহ্নিত হয়ে থাকুক ৩ মার্চ—লাল চাঁদের রাত।

