কলকাতার শীত যেন এ বছর একটু আলাদা রকম। কাগজে-কলমে দেখলে মনে হবে, তাপমাত্রা তো বাড়ছেই। তাহলে গায়ে এমন কাঁপুনি লাগছে কেন? সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হচ্ছে, কম্বলের বাইরে বেরোলেই ঠান্ডা হাওয়া বুকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। রোদ নেই, আকাশ মেঘলা, আর উত্তুরে হাওয়ার ঠান্ডা ছোবলে নাজেহাল শহরবাসী। এই পরিস্থিতি কতদিন চলবে, আর এর আসল কারণই বা কী—এই প্রশ্নই এখন সবার মুখে মুখে।
কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা: সংখ্যায় বাড়তি, অনুভবে বেশি শীত
গত বুধবার কলকাতায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তারপর ধীরে ধীরে পারদ ঊর্ধ্বমুখী। রবিবার শহরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল প্রায় ১৪.৯ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়েও সামান্য বেশি। হিসেবের খাতায় দেখলে তো মনে হওয়ার কথা, শীত কমছে। কিন্তু বাস্তবে উল্টো ছবি।
সকাল যত গড়াচ্ছে, ঠান্ডার তীব্রতাও যেন তত বাড়ছে। অনেকেই বলছেন, দুপুরেও রোদ না থাকায় ঠান্ডা ভাবটা কাটছেই না। এই বৈপরীত্যই ভাবাচ্ছে সবাইকে।
তাপমাত্রা বাড়লেও কেন বেশি ঠান্ডা লাগছে?
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের মতে, এই অস্বাভাবিক ঠান্ডার পেছনে মূল ভূমিকা নিচ্ছে মেঘলা আকাশ আর উত্তুরে হাওয়া। সাধারণত শীতের দিনে সূর্যের আলো উঠলে শরীর একটু আরাম পায়। কিন্তু কয়েক দিন ধরেই কলকাতা ও শহরতলির আকাশে রোদের দেখা নেই।
মেঘের আস্তরণ সূর্যের তাপকে আটকে দিচ্ছে। ফলে দিনের বেলাতেও তাপমাত্রা স্বাভাবিক ভাবে বাড়তে পারছে না। তার উপর উত্তুরে হাওয়ার দাপট ঠান্ডার অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই থার্মোমিটারে পারদ বাড়লেও শরীরের অনুভবে শীত বেশি লাগছে।
একটু সহজ করে বললে, রোদ না থাকলে ঘর গরম হয় না। ঠিক তেমনই, মেঘলা আকাশে শহরটা সারাদিন ঠান্ডা থেকে যাচ্ছে।
ভোরের তুলনায় দিনের বেলায় তাপমাত্রা কমছে কেন?
রবিবার ভোরে আবহাওয়া দফতরের বুলেটিনে জানানো হয়েছিল, কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৫.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু বেলার আপডেটে দেখা গেল, সেই তাপমাত্রাই নেমে এসেছে ১৪.৯ ডিগ্রিতে। অর্থাৎ, ভোরের পরেও দিনের বেলায় তাপমাত্রা কিছুটা কমেছে।
এর কারণও সেই মেঘলা আকাশ আর কুয়াশা। সূর্যের আলো না পেলে ভূপৃষ্ঠ গরম হয় না। ফলে দিনের বেলায়ও ঠান্ডা ভাব বজায় থাকে। অনেক জায়গায় দুপুর গড়ালেও হালকা কুয়াশা চোখে পড়েছে, যা শীতের অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
দক্ষিণবঙ্গে আবহাওয়ার পূর্বাভাস: সামনে কি আরও শীত?
আলিপুর আবহাওয়া দফতর আগেই জানিয়েছিল, কয়েক দিন তাপমাত্রা বাড়ার পর আবার তা কমবে। রবিবার থেকেই সেই পারদপতনের ইঙ্গিত মিলেছে। আগামী তিন দিনে দক্ষিণবঙ্গের তাপমাত্রা আরও দুই থেকে তিন ডিগ্রি কমতে পারে।
এর পরের তিন থেকে চার দিনে বড় কোনও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তবে আপাতত টানা পাঁচ দিন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে দুই থেকে চার ডিগ্রি কম থাকতে পারে। অর্থাৎ, শীতের কাঁপুনি এখনই বিদায় নিচ্ছে না।
যাঁরা ভাবছিলেন, দু-এক দিনের মধ্যেই শীত কমে যাবে, তাঁদের জন্য খবরটা একটু হতাশারই।
উত্তরবঙ্গেও একই ছবি, সঙ্গে বাড়তি সতর্কতা
শুধু দক্ষিণবঙ্গ নয়, উত্তরবঙ্গেও শীতের দাপট বজায় থাকবে। আলিপুর জানিয়েছে, উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে ঘন কুয়াশার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা কমে যেতে পারে ১৯৯ মিটার থেকে নেমে মাত্র ৫০ মিটার পর্যন্ত।
এই পরিস্থিতিতে ভোরের দিকে রাস্তায় চলাচল করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে জাতীয় সড়ক ও পাহাড়ি এলাকায় গাড়ি চালানোর সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
দার্জিলিঙে তুষারপাতের সম্ভাবনা, পাহাড়ে শীতের আমেজ
পাহাড়প্রেমীদের জন্য খবরটা রোমাঞ্চকর। আবহাওয়া দফতর জানাচ্ছে, দার্জিলিঙে তুষারপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তার সঙ্গে হালকা বৃষ্টিও হতে পারে। পাহাড়ে ইতিমধ্যেই ঠান্ডা বেশ চড়া, আর তুষারপাত হলে শীতের আমেজ আরও বাড়বে।
এ ছাড়া জলপাইগুড়ি, কালিম্পং এবং আলিপুরদুয়ারে বিক্ষিপ্ত ভাবে হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দক্ষিণবঙ্গের কোথাও বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।
দক্ষিণবঙ্গে কুয়াশার দাপট কোথায় বেশি?
দক্ষিণবঙ্গের বেশিরভাগ জায়গায় আপাতত হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা থাকবে। তবে পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম এবং মুর্শিদাবাদে ঘন কুয়াশার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সকালে অফিস বা স্কুলে বেরোনোর সময় এই জেলাগুলিতে দৃশ্যমানতা কম থাকতে পারে।
যাঁরা নিয়মিত ভোরে বেরোন, তাঁদের জন্য একটু সাবধান হওয়াই ভালো। ধীরে চলুন, আলো জ্বালিয়ে রাখুন, তাহলেই বিপদের ঝুঁকি কমবে।
কতদিন থাকবে এই শীতের কাঁপুনি?
সব মিলিয়ে বলা যায়, এখনই শীতের বিদায় ঘণ্টা বাজছে না। আগামী কয়েক দিন উত্তুরে হাওয়া, মেঘলা আকাশ আর কুয়াশার জেরে ঠান্ডা ভাব বজায় থাকবে। তাপমাত্রা ধীরে ধীরে ওঠানামা করলেও অনুভূত শীত কমার সম্ভাবনা আপাতত কম।
যদি রোদ উঠে আকাশ পরিষ্কার হয়, তবেই কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। তার আগে পর্যন্ত গরম জামাকাপড়টা হাতের কাছেই রাখাই বুদ্ধিমানের।
শেষ কথা: শীতকে যেমন আছে, তেমনই উপভোগ করুন
এই শীত একটু ধাঁধার মতো। সংখ্যায় কম, অনুভবে বেশি। সকালে গরম চা, দুপুরে উলের সোয়েটার, আর সন্ধ্যায় উত্তুরে হাওয়ার ঠান্ডা—সব মিলিয়ে কলকাতার শীত তার নিজস্ব রূপেই হাজির। তাই অভিযোগ না করে, এই আবহাওয়াটাকেই একটু উপভোগ করাই ভালো। কারণ, এই শীতই তো কয়েক দিনের মধ্যেই বিদায় নেবে।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
