রাজধানী ঢাকায় শীত এবার যেন আরও শক্তভাবে থাবা বসিয়েছে। রাত পোহালেই ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে পুরো শহর। সঙ্গে যোগ হয়েছে কনকনে ঠান্ডা আর হিমেল হাওয়া। শীতের এই তীব্রতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন, ব্যাহত হচ্ছে সড়ক, নৌ ও আকাশপথের যোগাযোগ।
শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ভোর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘন কুয়াশার দৃশ্য চোখে পড়ে। দূরের কথা, অনেক জায়গায় কাছের জিনিসও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। কুয়াশায় ঢেকে যায় রাস্তা, ভবন আর গাছপালা। মনে হচ্ছিল যেন ঢাকা শহর এক বিশাল সাদা চাদরের নিচে লুকিয়ে আছে।
ভোরের ঢাকা: কুয়াশায় ঢেকে যাওয়া চেনা শহর
সকালের প্রথম আলো ফোটার সময়ও কুয়াশার ঘনত্ব কমেনি। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, গুলশানসহ রাজধানীর প্রায় সব এলাকাতেই একই চিত্র দেখা গেছে। রাস্তায় বের হওয়া মানুষজনকে গরম কাপড়ের স্তর বাড়াতে হয়েছে। কেউ মোটা জ্যাকেট, কেউ আবার শাল-মাফলার জড়িয়ে ঠান্ডা সামলানোর চেষ্টা করছিলেন।
শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় সড়কে মানুষের চলাচল ছিল তুলনামূলক কম। তবু যাদের অফিস, জরুরি কাজ বা ভ্রমণের প্রয়োজনে বের হতে হয়েছে, তাদের পড়তে হয়েছে ভোগান্তিতে। অনেকেই বলছিলেন, এত গরম কাপড় পরেও ঠান্ডা যেন শরীর ভেদ করে ঢুকে পড়ছে।
যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন, হেডলাইট জ্বালিয়ে চলার দৃশ্য
ঘন কুয়াশার কারণে রাজধানীর সড়কগুলোতে যান চলাচল ছিল ধীরগতির। দৃশ্যমানতা কম থাকায় বাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের যানবাহনকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও তৈরি হয় ছোটখাটো যানজট।
বিশেষ করে ফ্লাইওভার, উড়ালসড়ক এবং খোলা এলাকায় চালকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে। অনেক চালকই ধীরে গাড়ি চালাচ্ছিলেন, যাতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়ানো যায়। ট্রাফিক পুলিশকেও দেখা গেছে সতর্ক অবস্থানে থাকতে।
শীতের তীব্রতায় দুর্ভোগে খেটে খাওয়া মানুষ
এই শীত সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষদের। রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, ফুটপাতের দোকানদারদের জন্য শীত যেন বাড়তি এক লড়াই। ভোরের ঠান্ডায় কাজে বের হওয়া তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
অনেকে জানান, কাজ না করলে সংসার চলে না। তাই শীত-জ্বর-ঠান্ডা উপেক্ষা করেই রাস্তায় নামতে হয়। তবে ঠান্ডার কারণে যাত্রীও কম থাকছে, এতে আয় কমে যাচ্ছে।
আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস: কুয়াশা থাকবে আরও
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আজ সারাদেশের আবহাওয়া সাময়িকভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত অনেক জায়গায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। কোথাও কোথাও এই কুয়াশা দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, রাত ও দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। তবে কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ার কারণে শীতের অনুভূতি কমবে না। বিশেষ করে ভোর ও সকালের দিকে ঠান্ডার তীব্রতা বেশি থাকবে।
বিমান, নৌ ও সড়ক যোগাযোগে ঝুঁকি
ঘন কুয়াশার কারণে শুধু রাজধানী নয়, সারাদেশেই যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ছে। আবহাওয়া অফিস সতর্ক করেছে, কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ এবং সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
ইতোমধ্যেই এর প্রভাব দেখা গেছে নৌপথে।
দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ
ঘন কুয়াশার কারণে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টা থেকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে সব ধরনের ফেরি সার্ভিস সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
কর্তৃপক্ষ জানায়, কুয়াশার ঘনত্ব এতটাই বেশি ছিল যে ফেরির ব্রিজ থেকে আশপাশের কোনো নৌযান বা তীরভূমি দেখা যাচ্ছিল না। দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যে নেমে আসায় যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মাঝ নদীতে আটকে ফেরি, দুই পাড়ে শতাধিক যানবাহন
ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় মাঝ নদীতে যাত্রী ও যানবাহনসহ নোঙর করে আছে দুটি ফেরি। পাশাপাশি দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়া ঘাটে পারাপারের অপেক্ষায় আটকা পড়েছে দুই শতাধিক যানবাহন। এর মধ্যে রয়েছে বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী লরি ও ব্যক্তিগত গাড়ি।
বাংলাদেশ নৌ-পরিবহন করপোরেশন, বিআইডব্লিউটিসি আরিচা এরিয়া অফিস জানিয়েছে, কুয়াশা কমে দৃশ্যমানতা স্বাভাবিক হলেই ফেরি চলাচল পুনরায় চালু করা হবে।
শীত ও কুয়াশা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
চিকিৎসকরা বলছেন, এই সময় শীতজনিত রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি যত্ন নেওয়া জরুরি। ঠান্ডা বাতাস থেকে বাঁচতে গরম কাপড় পরা, গরম খাবার খাওয়া এবং ভোরে অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
চালকদের জন্যও সতর্কতা জরুরি। কুয়াশায় গাড়ি চালানোর সময় গতি কম রাখা, হেডলাইট ও ফগ লাইট ব্যবহার করা এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।
নগরজীবনে শীতের প্রভাব
ঢাকা শহরের ব্যস্ত জীবন এই কুয়াশা ও শীতে খানিকটা থমকে গেছে। সকালে অফিসগামী মানুষের তাড়াহুড়ো কম, চায়ের দোকানে ভিড় একটু বেশি। গরম চা, কফি আর ভাপা পিঠার চাহিদা বেড়ে গেছে। শীত যেমন কষ্ট নিয়ে আসে, তেমনি কিছু ছোট ছোট আনন্দও এনে দেয়।
শেষ কথা
কুয়াশার চাদরে ঢাকা রাজধানী ঢাকায় শীত এখন প্রধান আলোচনার বিষয়। জনজীবন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নৌ ও সড়ক পরিবহণ—সবখানেই এর প্রভাব স্পষ্ট। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই পরিস্থিতি আরও কিছুদিন থাকতে পারে।
এই সময়ে প্রয়োজন সতর্কতা, ধৈর্য আর একটু বাড়তি যত্ন। শীতের এই কনকনে দিনে নিজের পাশাপাশি আশপাশের মানুষদের কথাও ভাবাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

