Homeশিল্প ও সাহিত্যসুরের সাধক ওস্তাদ মোশাররফ হোসেন: যশোরের সংগীত ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

সুরের সাধক ওস্তাদ মোশাররফ হোসেন: যশোরের সংগীত ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

Share

ওস্তাদ মোশাররফ হোসেন—নামটি উচ্চারণ করলেই যশোরের সংগীতপ্রেমীদের মনে ভেসে ওঠে গভীর শ্রদ্ধা আর মুগ্ধতার অনুভূতি। তাঁকে কেউ ডাকতেন সুরের যাদুকর, কেউ সুরসাগর, আবার কেউ বা সুর সম্রাট। এসব উপাধি কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছিল না, ছিল মানুষের হৃদয় থেকে উঠে আসা ভালোবাসার প্রকাশ। নিরহংকারী, প্রচারবিমুখ এই শিল্পী জীবনের প্রায় পুরোটা সময় কাটিয়েছেন সুরের সাধনায়। তাঁর সংগীত ছিল জোর করে শোনানোর নয়, বরং ধীরে ধীরে হৃদয়ে ঢুকে পড়ার মতো।

জন্ম ও শৈশব: সুরের আবহে বেড়ে ওঠা

১৯২৭ সালে ভারতের বনগ্রাম মহকুমার পশ্চিম পাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন মোশাররফ হোসেন। সেই সময় বনগ্রাম ছিল যশোর মহকুমার অন্তর্গত। সংগীত তাঁর জীবনে হঠাৎ করে আসেনি। ছোটবেলা থেকেই ঘরের ভেতর গান-বাজনার পরিবেশ ছিল। তাঁর মা নিজে গান করতেন। সেই সুরের মধ্যেই কিশোর মোশাররফ ধীরে ধীরে সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হন। এই পারিবারিক অনুপ্রেরণাই তাঁর জীবনের দিক নির্ধারণ করে দেয়।

সংগীত শিক্ষার কঠোর পথচলা

মোশাররফ হোসেনের আনুষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষার শুরু হয় বনগ্রামের ওস্তাদ মধুসূদন হাজরার কাছে। এখানেই তিনি সংগীতের প্রাথমিক ভিত গড়ে তোলেন। পরে উচ্চাঙ্গ সংগীতে নিজেকে নিখুঁত করে তুলতে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানে টানা আট বছর তিনি তালিম নেন প্রখ্যাত ওস্তাদ অধীর চক্রবর্তীর কাছে। এই দীর্ঘ সাধনার সময়টা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দিনের পর দিন রেওয়াজ, কঠোর অনুশীলন আর সুরের গভীরে ডুবে থাকার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে তাঁর নিজস্ব শিল্পীসত্তা।

নজরুলগীতি ও উচ্চাঙ্গ সংগীতে সাফল্য

কলকাতায় অবস্থানকালেই মোশাররফ হোসেনের কণ্ঠের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর ভরাট, পরিমিত আর আবেগঘন কণ্ঠে পরিবেশিত নজরুলগীতি শ্রোতাদের গভীরভাবে ছুঁয়ে যেত। পাশাপাশি উচ্চাঙ্গ সংগীতে তাঁর দক্ষতা তাঁকে এনে দেয় বিশেষ সম্মান। মালকোশ, ইমন, দরবারী, ভৈরব, বেহাগ, বিলাসখালী, টোড়ি ও বাগেশ্রী—এই সব রাগে তাঁর পরিবেশনা ছিল পরিশীলিত ও সংযত। সুরের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা আর নিয়ন্ত্রণ শ্রোতাদের মুগ্ধ করত।

দেশভাগ ও জীবনের বড় পরিবর্তন

১৯৪৭ সালের দেশভাগ তাঁর জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলে। মানসিকভাবে কিছুটা ভেঙে পড়েন তিনি। পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া সহজ ছিল না। অবশেষে ১৯৫২ সালে তিনি যশোরে চলে আসেন। তখন দেশভাগের কারণে যশোরের অনেক নামী শিল্পী ভারতে চলে গেছেন। ফলে এখানকার সংগীতচর্চা এক ধরনের শূন্যতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।

সুরবিতান সংগীত একাডেমি ও শিক্ষকতার দায়িত্ব

এই সংকটময় সময়ে মোশাররফ হোসেন যশোরের সংগীতজগতে এক নতুন আশার আলো হয়ে আসেন। তিনি যোগ দেন ‘সুরবিতান সংগীত একাডেমি’-তে। সংগীতপ্রিয় গোপাল গোস্বামীর প্রতিষ্ঠিত এই একাডেমির দায়িত্ব নিয়ে তিনি নিরলসভাবে কাজ শুরু করেন। তাঁর কঠোর অনুশীলন, শৃঙ্খলা আর আন্তরিকতায় ধীরে ধীরে সুরবিতান আবার প্রাণ ফিরে পায়। ১৯৭৫ সালে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন এবং ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

অন্যান্য সংগীত প্রতিষ্ঠানে অবদান

সুরবিতানের পাশাপাশি তিনি মাইকেল সংগীত একাডেমি এবং নওয়াপাড়ার কলতান সংগীত একাডেমির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি শুধু গান শেখাননি, শেখাতেন সংগীতের প্রতি দায়িত্ববোধ। তাঁর ছাত্রছাত্রীরা আজও বলেন, তিনি আগে মানুষ হতে শেখাতেন, তারপর শিল্পী।

বেতার, টেলিভিশন ও মঞ্চে উজ্জ্বল উপস্থিতি

ওস্তাদ মোশাররফ হোসেন খুলনা বেতারের নিয়মিত শিল্পী ছিলেন। নজরুলগীতি ও উচ্চাঙ্গ সংগীত ছিল তাঁর বিশেষ প্রিয় ক্ষেত্র। বাংলাদেশ টেলিভিশনেও তাঁর বহু গান প্রচারিত হয়েছে। দেশের নানা সাংস্কৃতিক মঞ্চে তাঁর পরিবেশনা তাঁকে পরিচিত করে তোলে বৃহত্তর শ্রোতামহলে। ঢাকার ‘শুদ্ধ সংগীত প্রসার গোষ্ঠী’র অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত হন।

পুরস্কার ও সম্মান, তবু বিনয়ী জীবন

১৯৫৮ সালে পাকিস্তান আমলে বেতার শিল্পীদের আয়োজিত সংগীত প্রতিযোগিতায় তিনি লাভ করেন ‘প্রেসিডেন্ট পুরস্কার’। এছাড়াও দেশজুড়ে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। কিন্তু এসব কিছুই তাঁর ব্যক্তিত্বে অহংকার আনতে পারেনি। তিনি ছিলেন সাদাসিধে, নির্লোভ এবং পুরোপুরি সংগীতনিষ্ঠ একজন মানুষ।

প্রয়াণ ও অমর উত্তরাধিকার

১৯৯৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর এই সুরসাধকের জীবনাবসান ঘটে। তবে তাঁর মৃত্যুতে যশোরের সংগীত থেমে যায়নি। তাঁর শিক্ষা, তাঁর শিষ্য আর তাঁর গড়ে তোলা সংগীতচর্চা আজও বহমান। যশোরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ওস্তাদ মোশাররফ হোসেন আজও এক জীবন্ত নাম।

লেখক: সাজেদ রহমান।

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন