Homeবিশ্ব সংবাদভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট অপহরণ পরিকল্পনা: আমেরিকার ডেল্টা ফোর্স কী?

ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট অপহরণ পরিকল্পনা: আমেরিকার ডেল্টা ফোর্স কী?

এই বাহিনী সাধারণ যুদ্ধের জন্য নয়। এদের কাজ একেবারে বিশেষ। যেমন প্রেসিডেন্ট অপহরণ ঠেকানো, বিদেশে আটকে পড়া নাগরিক উদ্ধার, জঙ্গি নেতাদের ধরপাকড়, কিংবা এমন মিশন যা প্রকাশ্যে কখনও বলা হয় না।

Share

বিশ্ব রাজনীতিতে যখনই গোপন অভিযান, প্রেসিডেন্ট অপহরণ বা সন্ত্রাসবিরোধী মিশনের কথা ওঠে, তখন এক নাম বারবার শোনা যায়—ডেল্টা ফোর্স। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার পরিকল্পনায় এই বাহিনীর নাম উঠে আসার পর নতুন করে কৌতূহল বেড়েছে। আসলে ডেল্টা বাহিনী কী? কেন পেন্টাগন এই ইউনিটের ওপর এতটা নির্ভরশীল? চল একটু সহজ করে পুরো বিষয়টা বুঝে নেওয়া যাক।

ডেল্টা ফোর্স কী এবং কেন এত আলোচিত

ডেল্টা ফোর্স হলো আমেরিকার সেনাবাহিনীর সবচেয়ে গোপন এবং অভিজাত ইউনিটগুলোর একটি। এই বাহিনী সাধারণ যুদ্ধের জন্য নয়। এদের কাজ একেবারে বিশেষ। যেমন প্রেসিডেন্ট অপহরণ ঠেকানো, বিদেশে আটকে পড়া নাগরিক উদ্ধার, জঙ্গি নেতাদের ধরপাকড়, কিংবা এমন মিশন যা প্রকাশ্যে কখনও বলা হয় না।

সহজভাবে বললে, যখন সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখনই ডেল্টা ফোর্স মাঠে নামে।

ডেল্টা বাহিনীর জন্মকথা

ডেল্টা ফোর্স তৈরি হয় ১৯৭৭ সালে। সেই সময় আমেরিকার সেনাবাহিনীতে এমন একটি ইউনিটের অভাব ছিল, যারা যেকোনো দেশে, যেকোনো পরিস্থিতিতে মুহূর্তের মধ্যে গোপন অভিযান চালাতে পারে।

এই ভাবনার পেছনে ছিলেন মার্কিন সেনার কর্নেল চার্লস বেকউইথ। তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বিখ্যাত ২২তম স্পেশাল এয়ার সার্ভিস রেজিমেন্ট বা SAS-এর সঙ্গে কাজ করেছিলেন। সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি আমেরিকায় একই ধরনের একটি বাহিনী গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। সেই উদ্যোগ থেকেই জন্ম নেয় ডেল্টা ফোর্স।

কোথা থেকে পরিচালিত হয় ডেল্টা ফোর্স

ডেল্টা বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি নর্থ ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগে। এখান থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গোপন নির্দেশ পাঠানো হয়। তবে বাহিনীর সদস্যরা কোথায় আছেন বা কোন মিশনে আছেন, তা প্রায় কখনোই প্রকাশ্যে আসে না।

এই ইউনিট কাজ করে মার্কিন স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের অধীনে। সরাসরি জবাবদিহি করতে হয় পেন্টাগনের জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডকে। তাই বলা যায়, ডেল্টা ফোর্স পেন্টাগনের একেবারে ভেতরের শক্তি।

ডেল্টা ফোর্সের পুরো নাম কী

ডেল্টা ফোর্সের অফিসিয়াল নাম হলো “স্পেশাল ফোর্সেস অপারেশনাল ডিটাচমেন্ট—ডেল্টা”। নামটা বেশ ভারী। তাই সবাই সহজ করে শুধু “ডেল্টা” বলেই চেনে।

এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাদের কাজের ধরন। অপারেশনাল মানে সরাসরি অ্যাকশন। ডিটাচমেন্ট মানে ছোট কিন্তু অত্যন্ত দক্ষ দল।

ডেল্টা বাহিনীর মূল কাজ কী

ডেল্টা ফোর্সের কাজের তালিকা ছোট হলেও ভয়ংকর রকমের কঠিন।

এই বাহিনী মূলত বন্দি উদ্ধার অভিযানে বিশেষজ্ঞ। বিদেশে যদি কোনো মার্কিন নাগরিক বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি জঙ্গিদের হাতে আটকে পড়েন, তখন প্রথম ভরসা ডেল্টা ফোর্স।

এছাড়া সন্ত্রাসবাদ দমন, গোপন নজরদারি, শত্রুপক্ষের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে অভিযান, কিংবা বিপজ্জনক এলাকায় অনুপ্রবেশ—সব ক্ষেত্রেই এরা সিদ্ধহস্ত।

ভাবো, অচেনা দেশে রাতের অন্ধকারে ঢুকে পড়া, কোনো শব্দ না করে কাজ শেষ করা, তারপর চোখের পলকে উধাও হয়ে যাওয়া—এই কাজটাই ডেল্টা ফোর্সের দৈনন্দিন রুটিন।

কী ধরনের প্রশিক্ষণ পান ডেল্টা ফোর্সের সদস্যরা

ডেল্টা বাহিনীর প্রশিক্ষণ এতটাই কঠিন যে সবাই টিকে থাকতে পারে না। শারীরিক শক্তি এখানে শুধু একটা অংশ। আসল পরীক্ষা হয় মানসিকভাবে।

স্বল্প দূরত্বে শত্রুকে নিখুঁতভাবে নিশানা করা, স্নাইপার চালানো, বিস্ফোরক ব্যবহার, লুকিয়ে ঢোকা ও বেরিয়ে আসা—সবকিছুতেই এদের আলাদা করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

অনেক সময় সদস্যদের সাধারণ মানুষের মতো মিশে যেতে হয়। দোকানদার, ট্যাক্সিচালক কিংবা পর্যটকের ছদ্মবেশেও কাজ করতে হয়। তাই ভাষা, আচরণ, এমনকি শরীরী ভাষা নিয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

ডেল্টা ফোর্সের গঠন কেমন

ডেল্টা ফোর্স মূলত চারটি স্কোয়াড্রনে বিভক্ত। প্রতিটি স্কোয়াড্রনের ভেতরে আবার তিনটি করে দল থাকে।

এই তিন দলের মধ্যে একটি দল স্নাইপার এবং তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে থাকে। তারা দূর থেকে পরিস্থিতি বোঝে, টার্গেট ঠিক করে এবং তথ্য দেয়।

বাকি দুটি দল সরাসরি অভিযানে নামে। মানে দরজা ভাঙা, বন্দি উদ্ধার, বা শত্রুকে নিষ্ক্রিয় করা—এই সব কাজ ওদের।

এই ছোট ছোট দলেই ডেল্টা বাহিনীর আসল শক্তি।

কোন কোন ঐতিহাসিক অভিযানে ডেল্টা ফোর্স জড়িত ছিল

ডেল্টা ফোর্সের বেশিরভাগ অভিযান আজও গোপন। তবুও কিছু মিশনের কথা বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ‘অপারেশন প্রাইম চান্স’-এ এই বাহিনীর ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়। ইরাক থেকে বন্দি উদ্ধারের অভিযানেও ডেল্টা ফোর্স গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে।

সোমালিয়ার কুখ্যাত ‘অপারেশন গথিক সার্পেন্ট’, যেখানে মার্কিন সেনারা ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল, সেখানেও ডেল্টা বাহিনী সক্রিয় ছিল।

আইএস নেতা আবু বকর আল-বাগদাদির বিরুদ্ধে অভিযানে এবং ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে বের করার প্রচেষ্টায়ও ডেল্টা ফোর্সের অবদান ছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত বিন লাদেনকে হত্যা করে নেভি সিলস।

ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গে ডেল্টা ফোর্সের নাম কেন উঠল

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার পরিকল্পনায় ডেল্টা ফোর্সের নাম উঠে আসে কারণ এই ধরনের রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর এবং ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের জন্য এই বাহিনীকেই সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করা হয়।

একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করা মানে শুধু সামরিক নয়, কূটনৈতিক বিস্ফোরণ। তাই এমন মিশনে এমন বাহিনী দরকার, যারা নিখুঁত পরিকল্পনা আর দ্রুত এক্সিকিউশনে পারদর্শী।

কেন ডেল্টা ফোর্স পেন্টাগনের সবচেয়ে বড় ভরসা

পেন্টাগনের কাছে ডেল্টা ফোর্স মানে শেষ অস্ত্র। যখন প্রচলিত সেনা বা কূটনৈতিক পথ কাজ করে না, তখন ডেল্টা ফোর্সই ভরসা।

এই বাহিনীর সদস্যরা প্রশ্ন করে না, আলোচনায় যায় না। তারা শুধু কাজটা করে আসে। নিঃশব্দে, নিখুঁতভাবে।

এই কারণেই ডেল্টা ফোর্সকে বলা হয় আমেরিকার সামরিক শক্তির এক অদৃশ্য স্তম্ভ।

সব মিলিয়ে, ডেল্টা ফোর্স শুধু একটি বাহিনী নয়। এটি পেন্টাগনের ছায়া শক্তি। যাদের নাম কম শোনা যায়, কিন্তু যাদের কাজ বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন