মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপলিস শহর শুক্রবার সাক্ষী থাকল এক ব্যতিক্রমী ও ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের। হিমশীতল মাইনাস ২০ ডিগ্রি তাপমাত্রা উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই অপসারণের দাবিতে। “আইসিই আউট অফ এমএন: ডে অফ ট্রুথ অ্যান্ড ফ্রিডম” শীর্ষক এই কর্মসূচি শুধু একটি মিছিল ছিল না, এটি ছিল ভয়, ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর।
মিনেসোটায় আইসিই কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। অভিবাসী সম্প্রদায়ের অভিযোগ, এই সংস্থার কার্যক্রম মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করছে। সেই ক্ষোভ আরও তীব্র হয় ৭ জানুয়ারির একটি ঘটনায়। ওইদিন আইসিই এজেন্টদের গুলিতে রেনি নিকোল গুড মারাত্মকভাবে আহত হন। এই ঘটনার পর থেকেই শহরজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং আইসিই বিরোধী আন্দোলন নতুন গতি পায়।
এই কর্মসূচির আয়োজকেরা একে শুধু প্রতিবাদ হিসেবে দেখেননি। তাদের মতে, এটি ছিল সত্য ও স্বাধীনতার জন্য একটি দিন। তাই তারা মানুষকে আহ্বান জানিয়েছিলেন কাজ, স্কুল এমনকি কেনাকাটা থেকেও বিরত থাকতে। উদ্দেশ্য ছিল একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া—আইসিই-এর উপস্থিতি আর মেনে নেওয়া হবে না।
শুক্রবার সকালে মিনিয়াপলিসের দ্য কমন্স এলাকা থেকে শুরু হয় বিশাল মিছিল। হাজার হাজার মানুষ সেখান থেকে টার্গেট সেন্টারের দিকে এগিয়ে যায়। মাইনাস ২০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় শ্বাস নেওয়াই যখন কঠিন, তখনও মিছিলকারীরা দৃঢ় পায়ে এগিয়ে চলে। অনেকের মুখে ছিল স্কার্ফ, হাতে গ্লাভস, তবু চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল দৃঢ়তা।
মিছিলে অংশ নেওয়া মানুষজন হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। কোথাও লেখা ছিল “নীরবতা হিমশীতলের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক”, কোথাও আবার “রেনি গুডের জন্য ন্যায়বিচার”। কেউ কেউ আরও সরাসরি ভাষায় দাবি তোলেন, “আমরা কী চাই? আইসিই বের হও! আমরা কখন চাই? এখন!”
এই স্লোগানগুলো শুধু শব্দ ছিল না। এগুলো ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আর ভয়ের বহিঃপ্রকাশ।
মিছিলে শুধু তরুণরা নয়, ছিলেন বৃদ্ধ, শিশু, ধর্মযাজক, সামাজিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিক। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের মানুষ একসঙ্গে হাঁটছিলেন। অনেকের মতে, এই ঐক্যই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি। স্কাইওয়াকগুলোতে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকরাও মিছিলকারীদের দিকে হাত নেড়ে সমর্থন জানান, যা আন্দোলনকারীদের মনোবল আরও বাড়িয়ে দেয়।
মিছিল শেষে মানুষজন টার্গেট সেন্টারের বাইরে জড়ো হন। বাইরে তীব্র শীত থাকলেও ভেতরে ঢোকার পর অনেকেই কিছুটা উষ্ণতার স্বস্তি পান। তবে নিরাপত্তা ছিল কড়া। এরিনার সামনে মেটাল ডিটেক্টরসহ একটি নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়েছিল। যদিও পুরো কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়।
ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ স্টেডিয়ামের আসনে বসে আছে। অনেকে সমন্বিতভাবে স্মারকলিপি নাড়িয়ে প্রতিবাদের ছন্দ বজায় রাখছিলেন। বড় পর্দায় ভেসে ওঠে বার্তা—“আইসিই বের হও মিনেসোটা থেকে।”
রেনি নিকোল গুডের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অনেকের মতে, এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আইসিই কার্যক্রমের বিপজ্জনক দিকের প্রতীক। তাই মিছিলে বারবার তার নাম উঠে আসে। মানুষ ন্যায়বিচারের দাবি তোলে এবং দায়ীদের জবাবদিহির কথা বলে।
মিনিয়াপলিস সিটি কাউন্সিলের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের প্রতিনিধি এলিজাবেথ শ্যাফার এই আন্দোলনের প্রশংসা করেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, হাজার হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে শহরের কেন্দ্রস্থলে মিছিল করেছে এবং টার্গেট সেন্টারে সমাবেশ করেছে। তার শেয়ার করা ছবিতে দেখা যায়, জাম্বোট্রনের পেছনে বড় বড় অক্ষরে লেখা “আইসিই বের হও মিনেসোটা থেকে।”
তার এই বক্তব্য আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করে।
এই বিশাল বিক্ষোভের পর প্রশ্ন উঠছে, মিনেসোটা থেকে আইসিই অপসারণের দাবি কি বাস্তবায়িত হবে? বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন রাজ্য ও ফেডারেল পর্যায়ে চাপ তৈরি করতে পারে। যদিও সিদ্ধান্ত একদিনে আসবে না, তবে এই কর্মসূচি যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বিষয়টিকে নিয়ে এসেছে, তা স্পষ্ট।
মিনিয়াপলিসের এই বিক্ষোভ প্রমাণ করেছে, তীব্র শীত কিংবা ভয় মানুষকে থামাতে পারে না, যদি দাবি ন্যায়সঙ্গত হয়। “আইসিই আউট অফ এমএন: ডে অফ ট্রুথ অ্যান্ড ফ্রিডম” শুধু একটি দিনের কর্মসূচি ছিল না।
এটি ছিল মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য একটি শক্ত অবস্থান। এই আন্দোলন ভবিষ্যতে কী রূপ নেবে, তা সময়ই বলবে। তবে এতটুকু নিশ্চিত, মিনেসোটা থেকে আইসিই অপসারণের দাবি আর উপেক্ষা করার মতো নয়।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

