Homeবিশ্ব সংবাদইন্ডিয়া নিউজভারত মহাসাগরে বড় সংঘর্ষ! মার্কিন টর্পেডোতে ডুবল ইরানের যুদ্ধজাহাজ- নিহত ৮৭

ভারত মহাসাগরে বড় সংঘর্ষ! মার্কিন টর্পেডোতে ডুবল ইরানের যুদ্ধজাহাজ- নিহত ৮৭

Share

বিশ্ব রাজনীতির উত্তেজনা নতুন মোড় নিল যখন ভারত মহাসাগরের বুকে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হওয়ার খবর সামনে আসে। পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘদিনের সংঘাত এবার ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সামুদ্রিক এলাকায়। শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে মার্কিন সাবমেরিন থেকে ছোড়া টর্পেডো হামলায় ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবে যায় বলে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে। এই ঘটনায় অন্তত ৮৭ জন নৌসেনা সদস্য নিহত হয়েছেন এবং আরও ৩২ জন আহত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছেন।

এই ঘটনা শুধু একটি সামরিক সংঘর্ষ নয়; বরং আন্তর্জাতিক জলসীমায় শক্তির প্রদর্শন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামলা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথেও এখন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে।

গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বারবার মাথা তুলেছে। তবে এতদিন সংঘাতের কেন্দ্র ছিল মূলত মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল। কিন্তু সাম্প্রতিক এই ঘটনা দেখিয়ে দিল যে সেই সংঘাত এখন অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে শুরু করেছে।

ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে টর্পেডো হামলা চালানো হয়েছে। ঘটনাটি ঘটে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলের কাছাকাছি, গল বন্দরের প্রায় ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে। আন্তর্জাতিক জলসীমার এত কাছে এমন হামলা হওয়ায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত মহাসাগর বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। এখানে সংঘাত বাড়লে তা বিশ্ব অর্থনীতির উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

খবর অনুযায়ী, যে ইরানি যুদ্ধজাহাজটি ডুবে গেছে সেটি সম্প্রতি ভারতের বিশাখাপত্তনমে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক নৌমহড়ায় অংশ নিয়েছিল। সেই মহড়া শেষ করে ফেরার পথেই জাহাজটি ভারত মহাসাগরের ওই এলাকায় পৌঁছেছিল।

যদিও এই ঘটনায় ভারতের নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবুও আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, কারণ ঘটনাটি এমন এক সময় ঘটল যখন বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনী যৌথ মহড়ার মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

ঘটনাটি ঘটে বুধবার ভোরের দিকে। প্রথমে কেউই বুঝতে পারেনি ঠিক কী ঘটেছে। জাহাজে হঠাৎ বিস্ফোরণ এবং তীব্র আঘাতের ফলে সেটি দ্রুত ডুবে যেতে শুরু করে।

শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল কোনও অজ্ঞাত সাবমেরিন থেকে হামলা হয়েছে। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের প্রাথমিক তদন্তেও একই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পরে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স মার্কিন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায় যে হামলাটি চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাবমেরিন।

এর কিছুক্ষণ পর পেন্টাগনও বিষয়টি স্বীকার করে। যদিও তারা সরাসরি শ্রীলঙ্কার উপকূলের কথা উল্লেখ করেনি, তবে আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করার কথা নিশ্চিত করেছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, মার্কিন সাবমেরিন আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে টর্পেডো হামলা চালিয়েছে এবং সেটি সম্পূর্ণভাবে ডুবে গেছে।

তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি টর্পেডো ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়েছে। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

হেগসেথের ভাষায়, “ইরানের যুদ্ধজাহাজটি ভেবেছিল আন্তর্জাতিক জলসীমায় তারা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু মার্কিন সাবমেরিন টর্পেডো হামলার মাধ্যমে সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে।”

তার এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র এই ঘটনার মাধ্যমে শক্ত বার্তা দিতে চেয়েছে।

ডুবে যাওয়া জাহাজটির নাম আইআরআইএস ডেনা। এটি ইরানের নৌবাহিনীর একটি আধুনিক যুদ্ধজাহাজ হিসেবে পরিচিত। জাহাজটিতে মোট ১৮০ জন নৌসেনা সদস্য ছিলেন।

শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিতা হেরাথ জানান, জাহাজটি যখন ডুবে যেতে শুরু করে তখন ভোর ৫টা ৮ মিনিটে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর কাছে জরুরি সাহায্যের বার্তা পাঠানো হয়।

বার্তা পাওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী।

জাহাজটি ডুবে যাওয়ার পর সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়েন বহু নৌসেনা সদস্য। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী দ্রুত উদ্ধারকারী জাহাজ ও হেলিকপ্টার পাঠায়।

তাদের প্রচেষ্টায় ৩২ জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৮৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। বাকিদের খোঁজে দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে তল্লাশি চালানো হয়।

উদ্ধার হওয়া নৌসেনা সদস্যদের চিকিৎসার জন্য শ্রীলঙ্কার নিকটবর্তী সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক জলসীমার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাধারণত আন্তর্জাতিক জলসীমাকে নিরপেক্ষ এলাকা হিসেবে ধরা হয়, যেখানে সব দেশের জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা থাকে।

কিন্তু সাম্প্রতিক এই হামলা দেখিয়ে দিল যে ভূরাজনৈতিক সংঘাত এখন সমুদ্রপথেও পৌঁছে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত মহাসাগর এখন কৌশলগতভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত এবং অন্যান্য শক্তিধর দেশের সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এই ঘটনার পর ইরান কী প্রতিক্রিয়া জানাবে তা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় প্রশ্ন। যদি ইরান পাল্টা পদক্ষেপ নেয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে।

একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে, কারণ তাদের কাছাকাছি সমুদ্রেই এই সংঘর্ষ ঘটেছে।

বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতা হল, সমুদ্র এখন শুধু বাণিজ্যের পথ নয়—এটি শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চও হয়ে উঠেছে। আর ভারত মহাসাগরের সাম্প্রতিক এই ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে দিল।

সংক্ষেপে বলা যায়, শ্রীলঙ্কার উপকূলে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনা শুধু একটি সামরিক হামলা নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতির নতুন উত্তেজনার ইঙ্গিত। আন্তর্জাতিক জলসীমা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য—সবকিছুই এখন নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। ভবিষ্যতে এই ঘটনার প্রভাব কত দূর পর্যন্ত গড়াবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন