Homeবিশ্ব সংবাদইন্ডিয়া নিউজডায়াবিটিসে বিশ্বে ভারতের অবস্থান: মধুমেহে ‘শ্রেষ্ঠ’ আসনের পথে কতটা এগোল দেশ

ডায়াবিটিসে বিশ্বে ভারতের অবস্থান: মধুমেহে ‘শ্রেষ্ঠ’ আসনের পথে কতটা এগোল দেশ

বেশি মিষ্টি খেলেই ডায়াবিটিস হয়। কথাটা পুরোপুরি ভুল না হলেও সমস্যাটা আরও গভীরে। দ্রুত নগরায়ন, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, ফাস্ট ফুডের উপর নির্ভরতা—

Share

ডায়াবিটিস এখন আর শুধু ব্যক্তিগত অসুখ নয়, এটি একেবারে সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আগে যাকে বলা হতো বয়স বাড়লে হওয়া রোগ, আজ সেই ডায়াবিটিস হানা দিচ্ছে তরুণদের শরীরেও। সকালে উঠে চা, দুপুরে ভাত, রাতে একটু মিষ্টি—সব মিলিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনেই যেন বিপদের বীজ লুকিয়ে আছে। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছে, ডায়াবিটিস আক্রান্তের সংখ্যায় বিশ্বে ‘শীর্ষ’ স্থানে পৌঁছতে ভারতের আর খুব বেশি দূরত্ব বাকি নেই।

ডায়াবিটিস কেন এত বড় উদ্বেগের কারণ

ডায়াবিটিস বা মধুমেহ এমন একটি রোগ, যার পুরোপুরি নিরাময় নেই। একবার শরীরে ঢুকলে সারা জীবন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। নিয়মিত ওষুধ, খাবারের কড়াকড়ি, ব্যায়াম—সব মিলিয়ে জীবনযাত্রা বদলাতে বাধ্য হন রোগীরা। সমস্যা এখানেই শেষ নয়। ডায়াবিটিস থাকলে হার্টের রোগ, কিডনি বিকল, চোখের সমস্যা, স্নায়ুর ক্ষতি—এই সব জটিলতার ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়।

ভাবুন তো, রাস্তায় বেরোলেই প্রতি ১৫ জনে একজন ডায়াবিটিসে ভুগছেন। সংখ্যাটা শুনতে অবাক লাগলেও এটাই এখন বাস্তব।

সাম্প্রতিক সমীক্ষা কী বলছে

বিশ্বখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল ‘দ্য ল্যান্সেট ডায়াবিটিস অ্যান্ড এন্ডোক্রিনোলজি’-তে প্রকাশিত এক গবেষণা নতুন করে আলোচনায় এনেছে বিষয়টি। ২০২৪ সালে প্রকাশিত এই সমীক্ষায় ২১৫টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০০৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত হওয়া ২৪৬টি গবেষণার ফল একত্র করে এই রিপোর্ট তৈরি হয়েছে। এই গবেষণায় ভারতীয় গবেষকরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন, যার মধ্যে ইন্ডিয়ান ডায়াবিটিস অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিরা ছিলেন।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৪৬ কোটির দেশে ভারতে বর্তমানে প্রায় ৯ কোটি মানুষ ডায়াবিটিসে আক্রান্ত। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ এই দীর্ঘমেয়াদি রোগের সঙ্গে লড়াই করছে।

বিশ্বে ডায়াবিটিস আক্রান্তের তালিকায় কারা এগিয়ে

এই মুহূর্তে ডায়াবিটিস রোগীর সংখ্যায় বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে চিন। ২০২৪ সালে সেখানে ডায়াবিটিস আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ কোটি। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভারত, যেখানে রোগীর সংখ্যা প্রায় ৯ কোটি। তৃতীয় স্থানে রয়েছে আমেরিকা, সেখানে ডায়াবিটিসে আক্রান্ত প্রায় ৩ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষ।

তবে গবেষকেরা এখানেই থামেননি। তাঁরা ভবিষ্যতের দিকেও তাকিয়েছেন। তাঁদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২৫ বছরে অর্থাৎ ২০৫০ সালের মধ্যে আমেরিকাকে পিছনে ফেলে তৃতীয় স্থানে উঠে আসতে পারে পাকিস্তান। সেখানে ডায়াবিটিস আক্রান্তের সংখ্যা এত দ্রুত বাড়ছে যে বিষয়টি বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ভারত কেন এত দ্রুত এই তালিকায় উপরে উঠছে

অনেকে ভাবেন, বেশি মিষ্টি খেলেই ডায়াবিটিস হয়। কথাটা পুরোপুরি ভুল না হলেও সমস্যাটা আরও গভীরে। দ্রুত নগরায়ন, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, ফাস্ট ফুডের উপর নির্ভরতা—সব মিলিয়ে ভারতীয়দের জীবনযাত্রা গত কয়েক দশকে আমূল বদলে গেছে।

একটা সহজ উদাহরণ ধরুন। আগে মানুষ হেঁটে বাজারে যেত, সাইকেলে অফিস করত। এখন লিফট, গাড়ি আর স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা—এই হলো দৈনন্দিন ছবি। শরীর না নড়লে শরীরের ভেতরের চিনি ঠিকভাবে ব্যবহার হয় না। সেখান থেকেই শুরু হয় বিপত্তি।

গরিব ও মধ্যবিত্তদের উপর কেন বেশি প্রভাব

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক বাস্তবতা। ২০২৪ সালে যেসব দেশ ও অঞ্চলে ডায়াবিটিসের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, সেগুলির বেশিরভাগ মানুষ গরিব, নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির। স্বাস্থ্যকর খাবার সবার নাগালে নেই। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর সুযোগও অনেকের নেই।

গবেষকেরা বলছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে যে ডায়াবিটিস রোগী বাড়বে, তার প্রায় ৯৫ শতাংশই এই দেশ ও অঞ্চলগুলিতে বাড়বে। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু স্বাস্থ্য নয়, এটি আর্থ-সামাজিক চ্যালেঞ্জও।

মেটাবলিক ডিজঅর্ডার বাড়ছে কেন

ডায়াবিটিসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত আরেকটি শব্দ হলো মেটাবলিক ডিজঅর্ডার বা বিপাকজনিত সমস্যা। ২০২৪ সালে বিশ্বে ২০ থেকে ৭৯ বছর বয়সিদের প্রায় ১১ শতাংশের মধ্যে এই সমস্যা দেখা গেছে। এর মানে শরীর খাবার থেকে শক্তি তৈরি করতে ঠিকভাবে পারছে না।

এই অবস্থা দীর্ঘদিন চললে ডায়াবিটিস, থাইরয়েড, উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ে। গবেষকদের অনুমান, ২০৫০ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়াবে ১৩ শতাংশে। সংখ্যার হিসেবে তা প্রায় ৮৫ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ।

ভবিষ্যতের ছবি কতটা ভয়ংকর

পরিসংখ্যানগুলো একত্র করলে ছবিটা সত্যিই চিন্তার। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ৫০ কোটির বেশি মানুষ ডায়াবিটিসে আক্রান্ত ছিলেন। গবেষকদের ধারণা, ২০৫০ সালে এই সংখ্যা ৯০ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ প্রায় প্রতি দশজনের একজন এই রোগে ভুগবেন।

ভারতের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় সামান্য শতাংশ বাড়লেই সংখ্যাটা বিশাল হয়ে যায়। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়ে, চিকিৎসা খরচ বাড়ে, কর্মক্ষমতা কমে যায়। সব মিলিয়ে দেশের উন্নয়নেও প্রভাব পড়ে।

ডায়াবিটিস ঠেকাতে কী করা জরুরি

এই পরিস্থিতিতে শুধু ভয় পেলেই চলবে না। সচেতনতা সবচেয়ে বড় অস্ত্র। নিয়মিত হাঁটা, ঘরে তৈরি খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও তেল এড়িয়ে চলা—এই ছোট অভ্যাসগুলোই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

আরেকটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা। অনেকেই জানতেই পারেন না যে তাঁর ডায়াবিটিস আছে। যখন ধরা পড়ে, তখন ক্ষতি অনেকটা হয়ে যায়। আগেভাগে জানলে নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।

শেষ কথা

ডায়াবিটিসে বিশ্বে ভারতের অবস্থান নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। ‘শ্রেষ্ঠ’ আসন এখানে গর্বের নয়, বরং সতর্কতার ঘণ্টা। এই রোগ একদিনে হয়নি, একদিনে যাবে না। তবে এখনই যদি জীবনযাত্রায় ছোট ছোট বদল আনা যায়, তাহলে ভবিষ্যতের ভয়ংকর ছবিটা অনেকটাই বদলানো সম্ভব।

আজ একটু হাঁটা, আজ মিষ্টি কম খাওয়া—এই ছোট সিদ্ধান্তগুলোই কালকে বড় বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন