বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের নাম নতুন করে আবার শিরোনামে। বছরের পর বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা তার তথাকথিত ‘এপস্টেইন ফাইল’ প্রকাশ্যে আসতেই চমকে উঠেছে গোটা দুনিয়া।
এই নথিতে উঠে এসেছে রাজনীতিক, ধনকুবের, আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিনোদন জগতের একাধিক পরিচিত মুখের নাম। আর সেই তালিকায় বলিউড পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপের নাম জড়াতেই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
জেফরি এপস্টেইন ছিলেন এক সময়ের প্রভাবশালী ফিনান্সার। কিন্তু তার মার্জিত চেহারার আড়ালে লুকিয়ে ছিল ভয়ংকর এক অন্ধকার জগৎ। নাবালিকা যৌন নির্যাতন, আন্তর্জাতিক পাচার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তার নাম আজও আতঙ্কের প্রতীক। সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা ইমেল ও নথিতে দাবি করা হয়েছে, এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের।
এই ইমেলগুলিই নতুন করে আগুনে ঘি ঢেলেছে। কারণ সেখানে বলিউডের কয়েকজন পরিচিত পরিচালকের পাশাপাশি অনুরাগ কাশ্যপের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জিউসেপ বার্সানি, জিনো ইউ এবং অরনেলা কোরাজার মতো কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে এপস্টেইনের ইমেল আদান-প্রদানের নথিতে অনুরাগ কাশ্যপকে ‘বলিউডের লোক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ইমেলগুলিতে কিউবা ও বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় পরিকল্পিত ভ্রমণ, কর্মশালা এবং বৈঠকের কথা বলা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সাংহাইয়ের একটি কর্মশালার প্রসঙ্গ। বলা হয়েছে, সেখানে বৌদ্ধধর্ম, প্রযুক্তি এবং চিকিৎসা বিষয়ক আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় অনুরাগ কাশ্যপের নাম ছিল। একই তালিকায় ছিলেন বেন গোয়ের্টজেল, ব্রুস ডেমার এবং ডিজে স্পুকির মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, যাদের ইমেলে ‘কুল গাই’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে।
এই তথ্য সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—তাহলে কি অনুরাগ কাশ্যপও পরোক্ষভাবে জেফরি এপস্টেইনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?
সমালোচনা তুঙ্গে উঠতেই চুপ থাকেননি অনুরাগ কাশ্যপ। বরং সরাসরি মুখ খুলে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তিনি। পরিচালকের কথায়, এই গোটা বিষয়টি তাকে ভীষণভাবে অবাক করেছে।
অনুরাগ জানান, “আমার নাম কীভাবে এই ইমেলগুলিতে এল, তা আমার কোনও ধারণাই নেই। আমি মাসে অন্তত ১৫টি বক্তৃতা বা অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পাই। তার মধ্যে খুব কম কটিরই উত্তর দিই।” তিনি আরও বলেন, বহু মাস আগে একটি আমন্ত্রণপত্র পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেটির কোনও জবাব তিনি দেননি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে তিনি কখনও বেইজিং যাননি। অথচ ইমেলে এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যেন তিনি সেখানে উপস্থিত থাকার কথা ছিল।
ভাইরাল হওয়া ইমেলগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনুরাগ কাশ্যপ। তার মতে, এই মেলগুলোর ভাষা এবং গঠনই সন্দেহজনক। তিনি বলেছেন, “এই বিক্ষিপ্ত উড়ো মেইলগুলো নিজেরাই নিজের ব্যাখ্যা দেয়। এগুলোকে প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না।”
তার কথায় স্পষ্ট হতাশা ধরা পড়েছে। কারণ কোনও যাচাই ছাড়াই তার নামকে একটি ভয়ংকর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। একজন সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য এমন অভিযোগ যে কতটা ক্ষতিকর, সেটাও তিনি ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছেন।
অনুরাগ কাশ্যপ এমন একজন পরিচালক, যিনি বরাবরই স্পষ্টভাষী। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তিনি খোলাখুলি মত প্রকাশ করেন। ফলে তার নাম বিতর্কে জড়ালে সেটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এপস্টেইন কেলেঙ্কারির সঙ্গে তার নাম জড়ানোয় বলিউডেও শুরু হয়েছে চাপা উত্তেজনা। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তথ্য যাচাই না করেই কীভাবে একজন পরিচালকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা যায়। আবার কেউ কেউ বলছেন, যেহেতু এপস্টেইন কেলেঙ্কারি আন্তর্জাতিক স্তরের, তাই সব নামই খতিয়ে দেখা দরকার।
এই পরিস্থিতিতে অনুরাগের সরাসরি বক্তব্য অনেকটাই ড্যামেজ কন্ট্রোলের কাজ করেছে।
সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে অনুরাগ কাশ্যপ জানিয়েছেন, এপস্টেইন ইমেলে যাকে ‘বলিউড গাই’ বলা হয়েছে, তিনি নিজে নন। তার দাবি অনুযায়ী, তিনি কখনও ওই ধরনের কোনও বৈঠক বা কর্মশালায় অংশ নেননি। এমনকি পরিকল্পনার স্তরেও তার সঙ্গে এপস্টেইনের কোনও যোগাযোগ ছিল না।
মজার ছলে তিনি এটাও বলেছেন, “যেভাবে আমার নাম চর্চার শিরোনামে উঠে এসেছে, আমার ছবিগুলো ততটা জনপ্রিয় নয়।” এই মন্তব্যে যেমন রসিকতা আছে, তেমনই আছে তীব্র বিদ্রূপ।
এপস্টেইন কেলেঙ্কারি আবারও দেখিয়ে দিল, কীভাবে যাচাইহীন তথ্য মুহূর্তের মধ্যে কাউকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। অনুরাগ কাশ্যপের ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও প্রমাণ সামনে আসেনি, যা তাকে এই ভয়ংকর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করে।
তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়—এপস্টেইন ফাইলের প্রতিটি নাম কতটা সত্য, আর কতটাই বা ভুল ব্যাখ্যা? এই উত্তর সময়ই দেবে। আপাতত অনুরাগ কাশ্যপ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি এই বিতর্কের অংশ নন।
গোটা ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দেয়, তথ্য যাচাই ছাড়া কোনও নাম জড়ানো কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে যখন বিষয়টি জড়িয়ে থাকে এক ভয়ংকর আন্তর্জাতিক অপরাধের সঙ্গে।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

