Homeআবহাওয়াইতিহাসের ভয়ংকর শীতঝড়? গোরেত্তির দাপটে UK জুড়ে জরুরি পরিস্থিতি

ইতিহাসের ভয়ংকর শীতঝড়? গোরেত্তির দাপটে UK জুড়ে জরুরি পরিস্থিতি

ঝড় গোরেত্তি আবারও দেখিয়ে দিল প্রকৃতির সামনে মানুষ কতটা অসহায়। এখন নজর সবার একটাই, কবে এই দুর্যোগ কাটিয়ে যুক্তরাজ্য আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।

Share

ঝড় গোরেত্তি যুক্তরাজ্যে আছড়ে পড়ার পর গোটা দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। প্রবল ঝোড়ো হাওয়া, ভারী তুষারপাত এবং হিমাঙ্কের নিচে নেমে যাওয়া তাপমাত্রার কারণে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। একের পর এক বিমানবন্দর তাদের রানওয়ে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাত কাটিয়েছেন এবং শত শত স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর এই পরিস্থিতিকে “বহু-বিপদজনক আবহাওয়া পরিস্থিতি” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ঝড় গোরেত্তি কী এবং কেন এত ভয়াবহ

ফরাসি আবহাওয়া সংস্থা মেটিও ফ্রান্সের দেওয়া নাম অনুযায়ী এই ঝড়ের নাম গোরেত্তি। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এটি শুধুমাত্র একটি সাধারণ শীতকালীন ঝড় নয়। এই ঝড়ের সঙ্গে একসঙ্গে তীব্র বাতাস, ভারী তুষারপাত, বৃষ্টি এবং বরফ জমার ঝুঁকি রয়েছে। অনেক এলাকায় এক রাতেই ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত তুষারপাত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, যা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে।

এই কারণেই আগেভাগেই দেশজুড়ে বিভিন্ন মাত্রার আবহাওয়া সতর্কতা জারি করা হয়। দক্ষিণ উপকূল ও ওয়েলসের বেশিরভাগ অংশে বাতাসের জন্য হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে, যেখানে ঘণ্টায় ৭০ মাইল পর্যন্ত দমকা হাওয়া বইতে পারে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের বিস্তীর্ণ এলাকায় তুষারপাতের জন্য হলুদ ও অ্যাম্বার সতর্কতা কার্যকর রয়েছে।

বিমানবন্দর বন্ধ, ফ্লাইট বাতিলে যাত্রী ভোগান্তি

ঝড় গোরেত্তির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বিমান চলাচলের ওপর। বার্মিংহাম বিমানবন্দর বুধবার রাতে সম্পূর্ণভাবে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। বৃহস্পতিবার সকালেও রানওয়ে বন্ধ থাকলেও যাত্রীদের নিরাপত্তা পরীক্ষা পুনরায় শুরু করা হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শেষ পর্যায়ের তুষার অপসারণ এবং নিরাপত্তা যাচাই চলেছে।

Images 10000 07

ইস্ট মিডল্যান্ডস বিমানবন্দর রানওয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও পরে তা আবার চালু করা সম্ভব হয়েছে। তবে যাত্রীদের দীর্ঘ বিলম্বের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শুধুমাত্র লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরেই ২৫টি প্রস্থান এবং ২৭টি আগমন বাতিল করা হয়েছে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের অনুরোধ করেছে, যাত্রার আগে নিজ নিজ এয়ারলাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সর্বশেষ তথ্য জেনে নিতে। নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে তারা জানিয়েছে।

বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হাজারো বাড়ি, উদ্ধার কাজে ব্যস্ত ন্যাশনাল গ্রিড

ঝড়ের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়। ন্যাশনাল গ্রিড জানিয়েছে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলস মিলিয়ে প্রায় ৭১ হাজার ৫০০টিরও বেশি বাড়ি ও স্থাপনা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। রাতভর তাদের কর্মীরা বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধারের কাজে ব্যস্ত ছিলেন।

সংস্থাটি জানায়, ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক এলাকায় সকাল ৮টার মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে গাছ উপড়ে পড়া এবং লাইনের ক্ষতির কারণে কিছু জায়গায় কাজ করতে বেশি সময় লাগছে।

এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ তুষারপাতের আশঙ্কা

ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই তুষারপাত গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হতে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, অনেক এলাকায় ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটার তুষারপাত স্বাভাবিক হলেও কোথাও কোথাও তা ১৫ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে মাইনাস ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত।

স্টোক-অন-ট্রেন্ট সিটি কাউন্সিল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া কিছু ভুল তথ্যের কারণে মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তারা স্পষ্ট করেছে, তাদের লবণ ও গ্রিটিং সরঞ্জামের ঘাটতি নেই এবং রাস্তা পরিষ্কারের কাজ চলমান রয়েছে।

রেল পরিষেবা সীমিত, যাত্রীদের ভ্রমণ এড়ানোর অনুরোধ

ঝড় গোরেত্তির প্রভাবে রেল যোগাযোগও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। নেটওয়ার্ক রেল জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ট্রেন পরিষেবা অত্যন্ত সীমিত আকারে চলছে এবং দুপুর পর্যন্ত এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস অঞ্চলে যাত্রীদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়াতে অনুরোধ করা হয়েছে।

লন্ডন নর্থওয়েস্টার্ন রেলওয়ে নিশ্চিত করেছে, বার্মিংহাম নিউ স্ট্রিট এবং লিভারপুল লাইম স্ট্রিটের মধ্যে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বরফ জমে যাওয়া লাইন ও সিগন্যাল সমস্যার কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সড়ক যোগাযোগে বিপর্যয়, গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ

জাতীয় মহাসড়ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কর্নওয়ালের A30 সড়কটি লংরক থেকে A394 এবং সেন্ট এর্থে A3074-এর মধ্যে উভয় দিকেই বন্ধ রাখতে হয়েছে। প্রবল বাতাসে অসংখ্য গাছ উপড়ে পড়ে রাস্তা অবরুদ্ধ করে রেখেছে। উদ্ধারকারী দল ও সড়ক কর্মীরা গাছ সরানোর কাজে ব্যস্ত থাকলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।

শত শত স্কুল বন্ধ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার

ঝড়ের কারণে শিক্ষা ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুক্রবার ২৫০টিরও বেশি স্কুল বন্ধ থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অ্যাবারডিনশায়ারে একাই ১৫০টির বেশি স্কুল বন্ধ রয়েছে। হাইল্যান্ডস, অ্যাবারডিন এবং মোরের বিভিন্ন এলাকাতেও স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে।

Images 10000 05

উত্তর স্কটল্যান্ডে বৃহস্পতিবার মোট ২৭৮টি স্কুল বন্ধ ছিল। যদিও এটি বুধবারের তুলনায় কম, সেদিন ৪৪০টিরও বেশি স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছিল। বার্মিংহাম এলাকায়ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে প্রায় ৬০টি স্কুল আজ বন্ধ রয়েছে।

সামনে কী পরিস্থিতি হতে পারে

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ঝড় গোরেত্তির প্রভাব ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও শুক্রবার পর্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। তুষার গলার পর বরফ জমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা আবার নতুন করে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কর্তৃপক্ষ সবাইকে সরকারি নির্দেশিকা মেনে চলার এবং অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে।

সব মিলিয়ে, ঝড় গোরেত্তি আবারও দেখিয়ে দিল প্রকৃতির সামনে মানুষ কতটা অসহায়। এখন নজর সবার একটাই, কবে এই দুর্যোগ কাটিয়ে যুক্তরাজ্য আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন