মাঘ মাস মানেই সাধারণত কনকনে ঠান্ডা, সকালে কুয়াশা আর গায়ে চাদর জড়িয়ে বসে থাকা। কিন্তু এবার যেন ছবিটা একটু আলাদা। মাঘের শুরুতেই দেশের কিছু এলাকায় গরমের হালকা আভাস মিলছে। বিশেষ করে টেকনাফে তাপমাত্রা ৩১ ডিগ্রির ঘরে পৌঁছে যাওয়ায় অনেকেই বলছেন, শীত কি তবে বিদায় নিতে শুরু করল?
সারাদেশের আবহাওয়ার বর্তমান চিত্র
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, সারা দেশে আজ আকাশ সাময়িকভাবে আংশিক মেঘলা থাকতে পারে। তবে তাপমাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। বুধবার সন্ধ্যা থেকে আগামী পাঁচ দিনের আবহাওয়ার দিকে তাকালেও খুব নাটকীয় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।
দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় একই রকম থাকতে পারে। মানে, হঠাৎ করে ঠান্ডা বেড়ে যাওয়ার বা গরম লাফিয়ে বাড়ার সম্ভাবনা কম। তবে ভোরের দিকে কিছু এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা দেখা দিতে পারে, যা শীতের শেষ দিকের চেনা ছবি।
শুষ্ক আবহাওয়া ও কুয়াশার সম্ভাবনা
এখন দেশের আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। বৃষ্টি বা ঝড়ের কোনো আশঙ্কা আপাতত নেই। শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের কিছু জায়গায় কুয়াশা পড়তে পারে। যারা ভোরে বের হন, বিশেষ করে মহাসড়কে চলাচল করেন, তাদের একটু সতর্ক থাকা ভালো।
শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, ঠোঁট ফাটা বা চোখে জ্বালাপোড়া—এগুলো অনেকেই টের পাচ্ছেন। এই সময়টায় পানি বেশি খাওয়া আর হালকা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে আরাম পাওয়া যায়।
সর্বনিম্ন তাপমাত্রা: বদলগাছীর শীতল সকাল
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে রাজশাহীর বদলগাছীতে। সেখানে তাপমাত্রা নেমেছিল ১০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। উত্তরাঞ্চলে শীত এখনো পুরোপুরি বিদায় নেয়নি, সেটা এখান থেকেই বোঝা যায়।
সকালে সেখানে কুয়াশার চাদর, ঠান্ডা বাতাস আর শিশিরে ভেজা ফসল—সব মিলিয়ে শীতের আসল আমেজ এখনো টিকে আছে। তবে দিনের বেলা রোদ উঠলেই ঠান্ডার তীব্রতা অনেকটাই কমে যাচ্ছে।
সর্বোচ্চ তাপমাত্রা: মাঘেই টেকনাফে গরমের ছোঁয়া
অন্যদিকে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে টেকনাফে। সেখানে তাপমাত্রা উঠেছে ৩১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। মাঘ মাসে এমন তাপমাত্রা অনেকের কাছেই একটু অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে।
দুপুরের দিকে রোদ বেশ তীব্র ছিল। যারা বাইরে কাজ করেন, তারা গরমের ভাবটা স্পষ্টই টের পেয়েছেন। অনেকে আবার মজা করে বলছেন, “শীতের কাপড় গুছাতে আর বেশি দেরি নেই।”
কেন মাঘেই এমন তাপমাত্রা?
আবহাওয়াবিদদের ভাষায়, এর পেছনে রয়েছে বড় আকারের বায়ুচাপের পরিবর্তন। বর্তমানে উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের একটি বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করছে। এর প্রভাবে দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকছে এবং তাপমাত্রা বড় পরিবর্তন দেখাচ্ছে না।
একই সঙ্গে মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে দেশের দক্ষিণ ও উপকূলীয় এলাকায় তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে।
আগামী পাঁচ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বর্ধিত পাঁচ দিনের পূর্বাভাসে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। মানে, সামনে বড় কোনো ঠান্ডা প্রবাহ বা ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
তাপমাত্রা থাকবে প্রায় একই রকম। সকালে হালকা কুয়াশা, দুপুরে রোদ আর বিকেলে মনোরম আবহাওয়া—এই চক্রটাই চলতে পারে। যারা ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য আবহাওয়া মোটামুটি অনুকূলে থাকবে।
কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব
এই ধরনের আবহাওয়া কৃষির জন্য মিশ্র প্রভাব ফেলতে পারে। শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে বোরো ধানের জমিতে সেচের প্রয়োজন বাড়তে পারে। আবার অতিরিক্ত কুয়াশা না থাকায় সবজি ও সরিষা চাষে কিছুটা সুবিধাও হচ্ছে।
দৈনন্দিন জীবনে মানুষ সকালে শীতের কাপড় পরলেও দুপুরে হালকা জামাকাপড়ে স্বস্তি পাচ্ছেন। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী আর অফিসগামীদের জন্য এই আবহাওয়া বেশ সহনীয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের ইঙ্গিত কি?
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, মাঘ মাসে এমন গরম কি জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষণ? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদিন বা দুই দিনের তাপমাত্রা দেখে বড় সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়। তবে শীতের সময়কাল ছোট হয়ে আসা এবং তাপমাত্রার এমন ওঠানামা ভবিষ্যতের জন্য ভাবনার বিষয়।
গত কয়েক বছরে শীত দেরিতে আসছে এবং দ্রুত চলে যাচ্ছে—এই অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। তাই আবহাওয়ার এই পরিবর্তনগুলো নজরে রাখা জরুরি।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে বলা যায়, মাঘের শুরুতেই দেশের আবহাওয়ায় এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি। কোথাও এখনো শীতের কামড়, আবার কোথাও গরমের আগাম বার্তা। আপাতত বড় কোনো পরিবর্তনের আশঙ্কা নেই। তাই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলাই সবচেয়ে ভালো উপায়।
সকালে কুয়াশা হলে একটু সতর্ক থাকা, দিনে রোদে বের হলে পানি সঙ্গে রাখা—এই ছোট বিষয়গুলোই এই সময়টায় অনেক কাজে দেয়। শীত আর গরমের এই দোলাচলের মাঝেই এগিয়ে যাচ্ছে দেশের আবহাওয়া।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
