Homeএক্সক্লুসিভকর্পোরেট জীবন থেকে ইঁদুরভরা নির্জন দ্বীপে—কেন এমন পথ বেছে নিলেন তিনি?

কর্পোরেট জীবন থেকে ইঁদুরভরা নির্জন দ্বীপে—কেন এমন পথ বেছে নিলেন তিনি?

Share

ভাবো তো, তুমি বহু বছর ধরে কর্পোরেট দুনিয়ায় কাজ করছো। বড় পদ, মোটা বেতন, সম্মান—সবই আছে। কিন্তু প্রতিদিনের কাজের চাপ তোমার ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। অফিসের মিটিং, ডেডলাইন, টার্গেট—সব মিলিয়ে যেন জীবনটাই আটকে গেছে কাচের ঘরে।

চীনের এক নারী ঠিক এমন অবস্থার মধ্যেই ছিলেন। প্রায় ২০ বছর কর্পোরেট জগতে কাজ করেছেন। উচ্চপদে ছিলেন, ভালো বেতন পেতেন, প্রভাবশালী মহলে ওঠাবসাও ছিল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, স্বপ্নের জীবন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।

একসময় তিনি বুঝলেন, শুধু টাকা থাকলেই সুখ পাওয়া যায় না। শান্তি দরকার। নিজের জন্য সময় দরকার।

একদিন তিনি একটি চাকরির বিজ্ঞাপন দেখলেন। সেখানে একজন কর্মী খোঁজা হচ্ছিল, যার কাজ হবে মাছের খাবারের মান যাচাই করা। কাজ খুব কঠিন নয়। কিন্তু বেতন? ভারতীয় মুদ্রায় মাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। আর ছুটি মাত্র দুই মাসে চার দিন।

কর্পোরেট জীবনের তুলনায় এই বেতন খুবই কম। অনেকেই এমন প্রস্তাব দেখলে হাসত। কিন্তু তিনি হাসেননি। বরং এক মুহূর্তও দেরি করেননি।

কারণ তাঁর দরকার ছিল অন্য কিছু—শান্তি, নির্জনতা, নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ।

নতুন চাকরি নিয়ে তিনি চলে গেলেন পূর্ব চীন সাগরের ওপর অবস্থিত এক নির্জন দ্বীপে। সেখানে কোনো মানুষের বসতি নেই। পুরো দ্বীপে তিনি একাই থাকেন।

ভাবতে পারো? চারপাশে শুধু সমুদ্র। ঢেউয়ের শব্দ। দূরে দিগন্ত। কোনো গাড়ির হর্ন নেই, কোনো অফিস কল নেই, কোনো মিটিং নেই।

তাঁর কাজ হলো মাছদের খাবারের মান দেখা, মাছগুলো কেমন বড় হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করা। কাজ খুব বেশি সময় নেয় না। ফলে দিনের বেশিরভাগ সময়ই তাঁর নিজের জন্য।

এটাই ছিল তাঁর আসল উদ্দেশ্য।

শহুরে জীবনে আমরা অনেকেই বলি, “একটু সময় পেলেই বই পড়তাম”, “সমুদ্রের ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখতাম”—কিন্তু সত্যি বলতে কি, সময় পাই না।

তিনি সেই সময়টুকু নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন।

দ্বীপে বসে তিনি বই পড়েন। সমুদ্রের ধারে বসে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখেন। কখনও মাছ ধরেন। কখনও শুধু ঢেউয়ের শব্দ শোনেন।

এই জীবনটা খুব সাদামাটা। কিন্তু তাতেই আছে গভীর শান্তি।

এই দ্বীপ থেকে মানুষের বসতি প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে, সেটাও সমুদ্রপথে অন্য একটি দ্বীপে। মাঝেমধ্যে একটি নৌকা এসে তাঁর জন্য খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে যায়।

তার মানে, তিনি একেবারেই একা।

আমরা যারা একা থাকতে ভয় পাই, তাদের কাছে বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। কিন্তু তিনি একাকীত্বকে ভয় পান না। বরং তিনি একাকীত্বকেই বেছে নিয়েছেন।

তবে জীবনটা একেবারে রূপকথার মতো নয়।

দ্বীপে প্রায়ই প্রবল বৃষ্টি হয়। ঝোড়ো হাওয়া ঘর কাঁপিয়ে দেয়। কখনও কখনও আবহাওয়া এতটাই খারাপ হয় যে বাইরে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

তার ওপর আছে ইঁদুরের উপদ্রব। দ্বীপে মানুষ না থাকলেও ইঁদুর আছে।

শুনে একটু অস্বস্তিকর লাগতেই পারে। কিন্তু তিনি এসব মেনে নিয়েছেন। কারণ তিনি জানেন, প্রতিটি জীবনেরই কিছু না কিছু অসুবিধা থাকে। শহরে ছিল মানসিক চাপ। এখানে আছে প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জ। তিনি দ্বিতীয়টাকে বেছে নিয়েছেন।

এই গল্প আমাদের একটা বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমরা আসলে কী চাই?

তিনি নিজের জীবনে অগ্রাধিকার বদলেছেন। কর্পোরেট সাফল্য ছেড়ে তিনি বেছে নিয়েছেন মানসিক শান্তি। অনেকের কাছে এটি পাগলামি মনে হতে পারে। কিন্তু তাঁর কাছে এটি মুক্তি।

আমরা অনেক সময় ভাবি, জীবন মানেই দৌড়। কিন্তু কখনও কখনও থামাটাও জরুরি। নিজের দিকে তাকানো দরকার। তিনি সেটাই করেছেন।

এই ঘটনাটি প্রথম প্রকাশ করে ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে।

কারণ এই গল্প শুধু একজন নারীর চাকরি বদলের গল্প নয়। এটি এক ধরনের জীবনদর্শন।

আজকের ব্যস্ত, প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে যেখানে সবাই আরও বেশি আয়, আরও বড় সাফল্যের পেছনে ছুটছে, সেখানে তিনি উল্টো পথে হাঁটলেন।

তিনি দেখিয়ে দিলেন, সুখের সংজ্ঞা সবার জন্য এক নয়।

সত্যি কথা বলতে কী, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। আমরা সবাই কখনও না কখনও ক্লান্ত হই। কিন্তু খুব কম মানুষই সবকিছু ছেড়ে নতুন পথে হাঁটার সাহস দেখায়।

তিনি সেই সাহস দেখিয়েছেন।

হয়তো তাঁর জীবন এখন ঝড়-বৃষ্টি আর ইঁদুরের সঙ্গে লড়াই করে কাটে। কিন্তু তাঁর মন শান্ত। তিনি নিজের সময়ের মালিক।

শেষ পর্যন্ত মানুষ তো সেটাই চায়—নিজের মতো করে বাঁচার স্বাধীনতা।

এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন একটাই। আমরা চাইলে দৌড়ের ট্র্যাকে থাকতেই পারি। আবার চাইলে সরে গিয়ে সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তও দেখতে পারি।

পছন্দটা আমাদের।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন