গ্যাংটক বা পেলিং এখন অনেকের কাছেই চেনা নাম। কিন্তু তুমি যদি সত্যিই একটু নিরিবিলি পাহাড় খুঁজে থাকো, যেখানে মেঘ এসে জানালায় ধাক্কা দেয় আর পাইন বনের গন্ধে সকাল শুরু হয়, তাহলে একবার চোখ রাখতেই হবে পূর্ব সিকিমের আরিতারের দিকে। এই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটা যেন সিকিমের এক লুকোনো রত্ন—শান্ত, সবুজ আর অবিশ্বাস্য সুন্দর।
পূর্ব সিকিমের রেনক সাব-ডিভিশনে অবস্থিত আরিতার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৬০০ ফুট উঁচুতে। ঐতিহাসিক ‘ওল্ড সিল্ক রুট’-এর খুব কাছেই এই গ্রাম। একসময় বাণিজ্যের পথ ছিল, আর এখন ভ্রমণপিপাসুদের স্বর্গ। এখানে এলে মনে হবে সময় যেন একটু ধীরে চলে। শহরের হর্ন নেই, ভিড় নেই, শুধু পাহাড়ের নিঃশ্বাস।
আরিতারে এসে যদি কোথাও প্রথমে দাঁড়াতে চাও, তাহলে সেটা হবে ল্যাম্পোখরি হ্রদ। জুতোর মতো আকৃতির এই হ্রদ সিকিমের অন্যতম প্রাচীন প্রাকৃতিক হ্রদ হিসেবে পরিচিত। এর পান্না সবুজ জল এতটাই স্থির যে দূরের গাছের ছায়া আয়নার মতো প্রতিফলিত হয়।
হ্রদের চারপাশে সারি সারি পাইন গাছ। তুমি যদি সকালে একটু হাঁটতে বের হও, দেখবে কুয়াশা ধীরে ধীরে সরছে আর হ্রদের জল রোদে ঝিলমিল করছে। পুরো জায়গাটা ঘিরে সুন্দর পাথওয়ে তৈরি করা হয়েছে। সেই পথে হাঁটতে হাঁটতে হালকা ঠান্ডা বাতাসে মন একেবারে হালকা হয়ে যায়।
এখানে এখন বোটিংয়ের ব্যবস্থাও আছে। ছোট নৌকায় বসে যখন মাঝখানে পৌঁছাও, চারপাশের নীরবতা তোমাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যাবে। সত্যি বলতে, এমন শান্ত হ্রদ খুব কম জায়গাতেই পাওয়া যায়।
প্রকৃতির পাশাপাশি আরিতারে ইতিহাসও লুকিয়ে আছে। ১৮৯৫ সালে নির্মিত একটি পুরনো ব্রিটিশ বাংলো এখনও এখানে দাঁড়িয়ে আছে গর্ব নিয়ে। পাথরের দেওয়াল আর পুরনো স্থাপত্য দেখে মনে হয় যেন ব্রিটিশ আমলের গল্পগুলো এখনও বাতাসে ভাসছে। এখন এই বাংলো পর্যটকদের থাকার জন্য ব্যবহৃত হয়। তুমি যদি একটু ভিন্ন অভিজ্ঞতা চাও, তাহলে এখানে এক রাত কাটাতে পারো।
আরও একটু এগোলে দেখা মিলবে আরিতার মনাস্ট্রি। তিব্বতি স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি এই গুম্ফা শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এটি সিকিমের সংস্কৃতি ও শিল্পকলার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভেতরে ঢুকলে দেয়ালে আঁকা রঙিন থাঙ্কা চিত্র আর প্রাচীন পাণ্ডুলিপি চোখে পড়ে। এক ধরনের গভীর শান্তি অনুভব করা যায় এখানে।
যদি একটু অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করো, তাহলে ছোট্ট একটি ট্রেক করে পৌঁছে যেতে পারো মানখিম ভিউ পয়েন্ট-এ। খুব কঠিন পথ নয়, তবে চড়াই আছে। হাঁটতে হাঁটতে পাইন বন আর পাহাড়ি গ্রামের দৃশ্য তোমাকে সঙ্গ দেবে।
চূড়ায় পৌঁছে যে দৃশ্য দেখবে, তা ভোলার নয়। নিচে ল্যাম্পোখরি হ্রদের পূর্ণ অবয়ব, আর দূরে তুষারঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা। পরিষ্কার দিনে সূর্যের আলো বরফের ওপর পড়ে এক অসাধারণ ঝিলিক তৈরি করে। মনে হবে যেন কেউ ক্যানভাসে সাদা আর নীল রঙে ছবি এঁকেছে।
ফটোগ্রাফি ভালোবাসলে এখানে ক্যামেরা নামাতে মন চাইবে না। আবার যদি শুধু চুপচাপ বসে থাকতে চাও, তাও পারো। জায়গাটা সেই সুযোগ দেয়।
আরিতারের অবস্থান এমন যে চাইলে আশপাশের আরও সুন্দর জায়গা ঘুরে দেখা যায়। খুব দূরে নয় লাভা আর রিশপ। অনেকেই উত্তরবঙ্গ ভ্রমণের সঙ্গে আরিতারকে জুড়ে নেন। এতে এক সফরেই পাহাড়ের ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখা যায়।
তবে সত্যি বলতে, আরিতার নিজেই এত শান্ত আর সুন্দর যে এখানে দু-তিন দিন থাকলেও একঘেয়েমি আসে না। বরং প্রতিদিন নতুন আলোয় পাহাড়কে নতুন লাগে।
আরিতার পৌঁছানো কঠিন নয়। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন বা শিলিগুড়ি থেকে শেয়ার জিপ কিংবা প্রাইভেট গাড়িতে প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। পাহাড়ি রাস্তা হলেও দৃশ্য এত সুন্দর যে সময় কেমন কেটে যায় বুঝতেই পারবে না।
সারা বছরই এখানকার আবহাওয়া মোটামুটি মনোরম। তবে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত বসন্ত আর গ্রীষ্মের শুরুতে পাহাড় সবুজে ভরে ওঠে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর শীতের শুরুতে আকাশ থাকে পরিষ্কার, কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য সবচেয়ে ভালো দেখা যায়। বর্ষাকালে কুয়াশা আর মেঘের আলাদা সৌন্দর্য থাকলেও মাঝে মাঝে ধসের ঝুঁকি থাকে, তাই তখন একটু সতর্ক থাকতে হয়।
আরিতারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ শুধু প্রকৃতি নয়, এখানকার মানুষও। এখানে বড় বড় হোটেলের বদলে হোমস্টে সংস্কৃতি বেশি জনপ্রিয়। স্থানীয় পরিবারের বাড়িতে থাকলে তুমি তাদের খাবার, জীবনযাপন আর সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে।
সাধারণ কিন্তু সুস্বাদু পাহাড়ি খাবার, উষ্ণ অভ্যর্থনা আর আন্তরিক ব্যবহার তোমার ভ্রমণকে অন্য মাত্রা দেবে। অনেক সময় সন্ধ্যায় বসে স্থানীয়দের কাছ থেকে পাহাড়ের গল্প শুনলে মনে হবে তুমি অতিথি নও, বরং পরিবারেরই একজন।
যদি তুমি গ্যাংটকের ভিড় এড়িয়ে একটু নির্জনতা খুঁজে থাকো, যদি চাও সকালে পাখির ডাক আর কুয়াশার চাদরে দিন শুরু করতে, তাহলে আরিতার একদম ঠিক জায়গা। এখানে সময় ধীরে চলে, মনও ধীরে শান্ত হয়।
অফবিট সিকিম ভ্রমণের তালিকায় আরিতার এখনো অনেকটাই অজানা। তাই ভিড় কম, পরিবেশ নির্মল। প্রকৃতি, ইতিহাস, ট্রেকিং আর স্থানীয় সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে এই ছোট্ট গ্রাম তোমাকে পূর্ণ এক পাহাড়ি অভিজ্ঞতা দেবে।
একবার গেলে বুঝবে, পাহাড় মানেই শুধু গ্যাংটক নয়। কখনও কখনও সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো লুকিয়ে থাকে এমন অচেনা, শান্ত জায়গাতেই। আরিতার ঠিক তেমনই এক গল্প—যেখানে মেঘেরা সত্যিই আসর বসায়।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

