অভ্রবরণ চট্টোপাধ্যায় : উত্তরবঙ্গের পর্যটন শিল্পে আবারও ফিরছে আশার আলো। দীর্ঘ অচলাবস্থার পর অবশেষে বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য খুলে গেল শিলিগুড়ি ও আশপাশের হোটেলের দরজা। এতদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গ্রেটার শিলিগুড়ি হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন। ফলে এখন থেকে বাংলাদেশ থেকে আসা পর্যটকেরা উত্তরবঙ্গের যেকোনও হোটেলে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারবেন।
গত কয়েক মাস পরিস্থিতি একেবারেই আলাদা ছিল। রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সীমান্ত উত্তেজনা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। তার প্রভাব সরাসরি পড়েছিল পর্যটন ব্যবসায়। বিশেষ করে শিলিগুড়ির হোটেল শিল্প বড়সড় ধাক্কা খেয়েছিল।
২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর থেকে শিলিগুড়ির হোটেল ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য রুম ও পরিষেবা দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। তখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে ব্যবসার চেয়ে নিরাপত্তা ও দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
তবে মানবিক কারণে কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছিল। মেডিকেল ভিসা বা স্টুডেন্ট ভিসায় যারা আসতেন, তাদের বিশেষ ক্ষেত্রে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কারণ অনেকেই চিকিৎসা বা পড়াশোনার প্রয়োজনেই ভারতে আসেন। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে আবারও বাংলাদেশে অশান্তি বাড়লে সম্পূর্ণভাবে পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ভাবতে পারেন, প্রতি মাসে যেখানে হাজার হাজার বাংলাদেশি পর্যটক আসতেন, সেখানে হঠাৎ সব বন্ধ। এটা হোটেল ব্যবসার জন্য কত বড় ধাক্কা, সহজেই বোঝা যায়।
সম্প্রতি বাংলাদেশে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন তারেক রহমান। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত মিলছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে থাকা ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলিও খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগও ইতিবাচক পথে এগোচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটেই শিলিগুড়ির হোটেল মালিকরা আবার নতুন করে ভাবতে শুরু করেন।
গ্রেটার শিলিগুড়ি হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক ও ভোটাভুটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে বাংলাদেশি পর্যটকদের উপর আর কোনও নিষেধাজ্ঞা থাকবে না।
সংগঠনের সম্পাদক সন্দীপ কুমার দাঁ জানিয়েছেন, প্রায় ৭৫ শতাংশ সদস্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। অর্থাৎ অধিকাংশ হোটেল মালিকই চান আবার আগের মতো ব্যবসা শুরু হোক।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি আবার ভারত-বিরোধী পরিবেশ তৈরি হয়, তাহলে প্রয়োজন হলে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ দরজা খুলেছে ঠিকই, কিন্তু সতর্কতা বজায় থাকছে।
কয়েক মাসের এই নিষেধাজ্ঞার ফলে হোটেল শিল্পে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে, প্রায় ৩ কোটিরও বেশি টাকার ক্ষতি হয়েছে এই সময়ে।
ভাবুন তো, প্রতিদিন যদি একাধিক রুম ফাঁকা থাকে, রেস্তোরাঁয় অতিথি না আসে, ট্যুর বুকিং বাতিল হয়—তাহলে কতটা লোকসান হয়! শুধু হোটেল মালিক নন, এর সঙ্গে জড়িত কর্মচারী, ড্রাইভার, ট্যুর গাইড, ছোট দোকানদার—সবার রোজগার কমে গিয়েছিল।
তবুও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দেশের স্বার্থকে আগে রাখা হয়েছে। এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, তাই আবারও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে চান তারা।
শিলিগুড়ি উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার। দার্জিলিং, কালিম্পং, সিকিম বা ডুয়ার্স—যেখানেই যান না কেন, অনেকেই আগে শিলিগুড়িতে ওঠেন। এখানে প্রায় ২৭০টি হোটেল রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৮৫টি হোটেল হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে।
বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষ ভারতে আসেন। তাদের বড় অংশ চিকিৎসা ও উচ্চশিক্ষার জন্য। অনেকেই আবার পরিবারের সঙ্গে ঘুরতেও আসেন। আগে যেখানে হাজার হাজার মানুষ আসতেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা নেমে দাঁড়ায় মাসে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ জনে।
এই সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি পড়েছিল উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিতে। এখন আবার সেই সংখ্যা বাড়ার আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
দুই দেশের সম্পর্ক কখনও শুধু কাগজে-কলমে থাকে না। এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ে। চিকিৎসা, পড়াশোনা, ব্যবসা, পর্যটন—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে জড়িত।
নতুন সরকারের আগমনের পর দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা আদানপ্রদান শুরু হয়েছে। অতীতের তিক্ততা ভুলে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর চেষ্টা চলছে। এই পরিবর্তনের হাওয়াই শিলিগুড়ির হোটেল শিল্পে প্রাণ ফিরিয়েছে।
একসময় যে সিদ্ধান্ত ছিল কঠোর ও প্রয়োজনীয়, আজ পরিস্থিতি বদলে সেটাই আবার শিথিল হয়েছে। এটা দেখেই বোঝা যায়, রাজনীতি যেমন বদলায়, তেমনই বদলায় অর্থনীতি ও ব্যবসার সমীকরণও।
এখন সবার নজর আগামী কয়েক মাসের দিকে। বুকিং ধীরে ধীরে বাড়বে কি না, বাংলাদেশি পর্যটকরা আগের মতো ফিরবেন কি না—সবটাই সময় বলবে।
তবে একটা কথা স্পষ্ট, উত্তরবঙ্গ আবারও অতিথিদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। হোটেলের দরজা খুলেছে। কর্মচারীদের মুখে আবার হাসি ফিরেছে। ব্যবসায়ীরা নতুন করে আশায় বুক বাঁধছেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সংসদ ভবনে আটকে থাকে না। তার ঢেউ পৌঁছে যায় সীমান্ত শহরের হোটেল লবিতেও। আর সেই ঢেউ এখন উত্তরবঙ্গে নিয়ে এসেছে নতুন সম্ভাবনার বার্তা।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

