Homeটকিং পয়েন্টনীরব ছবির ভিতরে ঝড় — বিপ্লবী শিল্পী সমীর মজুমদার স্মরণে

নীরব ছবির ভিতরে ঝড় — বিপ্লবী শিল্পী সমীর মজুমদার স্মরণে

Share

শিল্প কখনো নিরপেক্ষ নয়। সংস্কৃতি কখনো নির্দোষ নয়। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শিল্প হয় শোষকের হাতিয়ার, নয়তো শোষিত মানুষের অস্ত্র। এই ঐতিহাসিক সত্যকে জীবন ও সৃষ্টিতে ধারণ করেছিলেন চিত্রশিল্পী সমীর মজুমদার। তাঁর জন্মদিন ৬ মার্চ ২০২৬ উপলক্ষে আমরা স্মরণ করি এক এমন শিল্পীকে, যিনি কেবল ছবি আঁকেননি—তিনি সময়কে ধারণ করেছেন, সংগ্রামকে রূপ দিয়েছেন এবং নীরব মানুষের ভাষাকে ক্যানভাসে দৃশ্যমান করেছেন।

তিনি জন্মেছিলেন বাংলার লাল মাটির ভেতর থেকে—যে মাটি কৃষকের ঘামে সিক্ত, শ্রমিকের রক্তে চিহ্নিত, ইতিহাসের দগদগে ক্ষত বয়ে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। সেই মাটিই ছিল তাঁর রঙের উৎস, সেই মাটিই ছিল তাঁর দৃষ্টির ভিত, সেই মাটিই ছিল তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান। তাঁর শিল্পে প্রকৃতি নিছক সৌন্দর্যের বিষয় নয়; প্রকৃতি সেখানে উৎপাদনের ক্ষেত্র, মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রেক্ষাপট। মাঠ মানে জমির প্রশ্ন, নদী মানে জীবিকার প্রশ্ন, ঘর মানে টিকে থাকার প্রশ্ন।

তিনি বুর্জোয়া শিল্পের ভণ্ড নিরপেক্ষতাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন দৃঢ়ভাবে। গ্যালারি-কেন্দ্রিক সৌন্দর্যবোধ, শহুরে মধ্যবিত্তের আরামপ্রিয় রুচি, অলংকারমুখর বিমূর্ততার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সামাজিক অসংবেদনশীলতাকে তিনি মেনে নেননি। তাঁর শিল্প ছিল না বাজারমুখী, ছিল না প্রশংসালাভের জন্য নির্মিত; বরং ছিল এক নীরব কিন্তু গভীর প্রতিবাদ। তিনি জানতেন, যে সমাজে মানুষ শোষিত, সেখানে “শুধু সুন্দর” শিল্প আসলে শোষণের পক্ষেই অবস্থান নেয়।

সমীর মজুমদারের ছবির মানুষ কোনো বিমূর্ত মানবতার প্রতীক নয়; তারা শ্রেণির মানুষ। কৃষক, ক্ষেতমজুর, শ্রমজীবী নারী, অনাহারে ক্লান্ত শিশু—এরা ইতিহাসের প্রান্তিক চরিত্র নয়, বরং উৎপাদনের কেন্দ্রীয় শক্তি। তাঁর ক্যানভাসে তারা করুণার অবলম্বন হয়ে ওঠে না; তারা উপস্থিত থাকে নিজেদের মর্যাদা ও বাস্তব অবস্থান নিয়ে। এই উপস্থিতিই রাজনৈতিক, এই দৃশ্যমানতাই প্রতিরোধ।

Images 10000 02

তিনি শ্লোগান আঁকেননি; কারণ তিনি জানতেন, শ্লোগানের আগে দরকার চেতনা। তাঁর ছবির নীরবতা জনগণের দীর্ঘ নীরবতার প্রতিধ্বনি—যা জমে ওঠে বছরের পর বছর শোষণ ও বঞ্চনার ভেতর দিয়ে। এই নীরবতা পরাজয়ের নয়; এটি বিস্ফোরণের পূর্ব মুহূর্তের স্তব্ধতা। রঙের সংযম, রেখার কঠোরতা, টেক্সচারের রুক্ষতা—সবই ছিল তাঁর শ্রেণিগত অভিজ্ঞতার শিল্পরূপ। সৌন্দর্য এখানে কোনো বিচ্ছিন্ন অলংকার নয়; সৌন্দর্য এসেছে সত্য থেকে, আর সেই সত্য এসেছে উৎপাদন সম্পর্কের গভীর উপলব্ধি থেকে।


লোকজ উপাদান তাঁর কাছে ছিল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ভাষা। শাসক সংস্কৃতির আধিপত্যের বিপরীতে তিনি জনগণের নিজস্ব নান্দনিকতাকে তুলে ধরেছেন। এই কাজ নিছক শিল্পচর্চা নয়; এটি ছিল সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে অবস্থান নেওয়া—এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম।

তাঁর শিল্পকর্মের গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-তে তাঁর তিনটি চিত্রকর্ম সরকারি ভাবে সংরক্ষিত আছে। এটি কেবল ব্যক্তিগত স্বীকৃতি নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাঁর শিল্পভাবনার ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্বীকৃতি। রাষ্ট্রীয় সংগ্রহে অন্তর্ভুক্ত হওয়া মানে তাঁর শিল্পকর্ম সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত হয়ে আছে।

এই অর্থে সমীর মজুমদার ছিলেন এক বিপ্লবী শিল্পী—যিনি জানতেন শ্রেণিসংগ্রাম শুধু কারখানা, মাঠ বা রাজপথে সীমাবদ্ধ নয়; শ্রেণিসংগ্রাম চলে রঙে, রেখায়, ক্যানভাসে, দৃষ্টিতে। তিনি দেখিয়েছেন, শিল্প মানে কেবল নান্দনিক বিন্যাস নয়; শিল্প মানে অবস্থান, শিল্প মানে ইতিহাসের পক্ষে দাঁড়ানো।
লাল মাটির থেকে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী আজ মাটিতেই ফিরে গেছেন। কিন্তু তাঁর শিল্প রয়ে গেছে—সংগ্রামের স্মৃতি হয়ে, চেতনার বীজ হয়ে, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা হয়ে। যতদিন শোষণ থাকবে, যতদিন মানুষ নিজের ভাষা ও মর্যাদা খুঁজবে—ততদিন তাঁর শিল্প প্রাসঙ্গিক থাকবে।

৬ মার্চ ২০২৬-এ তাঁর জন্মদিনে আমরা শুধু একজন শিল্পীকে স্মরণ করি না; আমরা স্মরণ করি এক সাংস্কৃতিক অবস্থানকে, এক নান্দনিক সংগ্রামকে, এক বিপ্লবী চেতনার ধারককে।

শিল্প জনগণের।
শিল্প সংগ্রামের।
শিল্প মুক্ত মানুষের

লেখক: — কাইয়ুম শিকদার।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন