ক্রিকেট বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, উত্তেজনা আর গ্যালারির রঙিন মুহূর্ত। কিন্তু ইডেন গার্ডেন্স-এ ইতালি বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচে যা দেখা গেল, তা সত্যিই বিরল। ইতালির ব্যাটার মার্কাস কাম্পোপিয়ানোর পরিবার এমন এক সমর্থনের নজির গড়ল, যা শুধু ম্যাচ নয়, মনও জিতে নিল।
১১ জনের একটি পরিবার, সকলেই ইতালির জার্সি পরে মাঠে এসেছেন। কিন্তু জাতীয় সঙ্গীত বাজতেই দেখা গেল অন্য ছবি। ইতালির জাতীয় সঙ্গীতে গলা মেলানোর পর ইংল্যান্ডের জাতীয় সঙ্গীতেও সমান আবেগে গান গাইলেন তাঁরা। গ্যালারিতে উপস্থিত অনেকেই অবাক। প্রশ্ন উঠল, এ কেমন সমর্থন?
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইতালির মুখোমুখি ইংল্যান্ড। স্বাভাবিকভাবেই দুই দেশের সমর্থকেরা নিজেদের দলকে উৎসাহ দেবেন। কিন্তু কাম্পোপিয়ানো পরিবার যেন দুই দেশকেই নিজের মনে করে। ম্যাচের প্রথম বলেই যখন ইংল্যান্ডের ব্যাটার ফিল সল্ট চার মারলেন, তখন ইতালির জার্সি পরা এই পরিবারকেই লাফিয়ে উঠতে দেখা গেল।
আসলে ব্যাপারটা অনেক গভীর। পরিবারের সদস্য ইজ়ি পরিষ্কার করে বললেন, তাঁরা ইতালীয় হলেও তিন পুরুষ ধরে ইংল্যান্ডে বসবাস করছেন। জন্ম, বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা—সবই ইংল্যান্ডে। ফলে ইংল্যান্ডও তাঁদের নিজের দেশ। তাই দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীতই তাঁদের হৃদয়ের সঙ্গে জড়িয়ে।
ভাবুন তো, আপনি যদি জন্মান এক দেশে, কিন্তু শিকড় থাকে অন্য দেশে—তাহলে কোনটাকে বেশি ভালোবাসবেন? অনেক সময় উত্তরটা হয়, দুটোই।
ইতালি মানেই ফুটবল—এটাই আমাদের ধারণা। কিন্তু কাম্পোপিয়ানো পরিবারের কাছে ফুটবলের চেয়ে বড় ক্রিকেট। পরিবারের কর্তা জিয়ান্নি জানালেন, তাঁর বাবা সাসেক্সের হয়ে ক্রিকেট খেলতেন। সেই থেকেই পরিবারে ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা।
মার্কাস ছোট থেকেই ক্রিকেটে আগ্রহী। এখন তিনি পেশাদার ক্রিকেটার। ইংল্যান্ডে থেকে তিনি সাসেক্সের দ্বিতীয় দলের হয়ে নিয়মিত খেলেন। পাশাপাশি সারে কাউন্টি ক্লাবের স্ট্রেন্থ অ্যান্ড কন্ডিশনিং কোচ হিসেবেও কাজ করছেন। তিনি ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের লেভেল থ্রি কোচও।
মানে, ক্রিকেট তাঁর শুধু প্যাশন নয়, পেশাও। আর যাদের বিরুদ্ধে খেলছেন, তাঁদের অনেকেই তাঁর পরিচিত। একদিকে আন্তর্জাতিক ম্যাচ, অন্যদিকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক—ভাবতেই পারেন কী চাপের পরিস্থিতি!
কাম্পোপিয়ানো পরিবার শুধু কলকাতাতেই নয়, মুম্বইয়েও ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন। ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম-এও তাঁরা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু কলকাতাই তাঁদের বেশি ভালো লেগেছে।
বেলিন্ডা বললেন, মুম্বইয়ে গরম বেশি, কলকাতার আবহাওয়া তুলনামূলক আরামদায়ক। তাঁর কথায় বোঝা গেল, শহরের পরিবেশ তাঁদের মন ছুঁয়ে গেছে। অনিতা আবার মজা করে বললেন, যদি চারটে ম্যাচ চার শহরে হত, তাহলে আরও ভালো লাগত। ভারতকে একটু বেশি ঘোরার সুযোগ মিলত।
এ কথায় একটা বিষয় স্পষ্ট—তাঁরা শুধু খেলা দেখতে আসেননি, দেশটাকেও অনুভব করছেন।
ইতালির ফুটবল দল সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই গ্যাভিন প্রায় থামিয়ে দিলেন—এখন শুধু ক্রিকেট। ফুটবল নিয়ে ভাবার সময় নেই। তাঁরা এত দূর এসেছেন বিশ্বমানের ক্রিকেট দেখতে।
এই কথায় বোঝা যায়, ক্রিকেট তাঁদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জনপ্রিয় খেলা ফুটবল হলেও, তাঁদের হৃদয়ে জায়গা নিয়েছে ক্রিকেট।
এই গল্পে সবচেয়ে আবেগঘন অংশ হয়তো বেথের। তিনি মার্কাসের স্ত্রী। অথচ এখনও স্বামীর ব্যাটিং মাঠে বসে দেখা হয়নি তাঁর।
প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে মার্কাস সুযোগ পাননি। দ্বিতীয় ম্যাচে নেপালের বিরুদ্ধে দলে থাকলেও ব্যাট করার প্রয়োজন হয়নি, কারণ ইতালি ১০ উইকেটে জিতে যায়। ফলে বেথের অপেক্ষা থেকেই যায়।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে তিনি আশা করছেন, এবার স্বামীর ব্যাটিং দেখবেন। খেলা শেষে কোথায় গেলে দেখা হবে, কোন দিক দিয়ে সাজঘরে যেতে হয়—সব জেনে রাখছেন তিনি। এই অপেক্ষা যেন শুধু একজন সমর্থকের নয়, একজন স্ত্রীরও।
ভাবুন তো, স্টেডিয়ামে বসে আপনি অপেক্ষা করছেন, কখন প্রিয় মানুষটা মাঠে নামবে। সেই উত্তেজনা, সেই আশা—এটাই তো খেলাধুলার আসল সৌন্দর্য।
ম্যাচ চলাকালীন দেখা গেল অদ্ভুত এক দৃশ্য। ইতালির উইকেট পড়লেও তাঁরা প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন, আবার ইংল্যান্ড ছক্কা মারলেও হাততালি দিচ্ছেন। যেন খেলাটাকেই উদ্যাপন করছেন।
উপমহাদেশের ক্রিকেট মাঠে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। এখানে সমর্থন সাধারণত একমুখী। কিন্তু কাম্পোপিয়ানো পরিবার দেখাল, খেলাকে ভালোবাসা মানে শুধু নিজের দল নয়, পুরো খেলাটাকেই ভালোবাসা।
ইংল্যান্ডের ইনিংস শেষ হওয়ার সময় ইডেনের ঘাসে লম্বা ছায়া পড়েছে। গ্যালারিতে বসে ১১ জনের সেই পরিবার অপেক্ষা করছে। তাঁদের চোখে উত্তেজনা, মুখে হাসি। তাঁরা অপেক্ষা করছেন বিশ্বকাপার মার্কাসের ব্যাটিং দেখার।
এই গল্পটা আসলে শুধু ইতালি বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচের নয়। এটা প্রবাস, শিকড়, পরিচয় আর ভালোবাসার গল্প। যেখানে একজন মানুষ একই সঙ্গে দুই দেশকে ভালোবাসতে পারে। যেখানে সমর্থন মানে বিভাজন নয়, সংযোগ।
ক্রিকেট বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এমন মানবিক মুহূর্তই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—খেলা শেষ পর্যন্ত মানুষকেই কাছাকাছি আনে। আর ইডেন গার্ডেন্সের সেই দিনটা প্রমাণ করে দিল, জাতীয়তা আলাদা হতে পারে, কিন্তু আবেগের ভাষা এক।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

