Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডআইপিএল স্পেশাল১১ জনের মৃত্যুর সেই মাঠেই আইপিএল ফাইনাল! চিন্নাস্বামীর ভাগ্য বদলের গল্প

১১ জনের মৃত্যুর সেই মাঠেই আইপিএল ফাইনাল! চিন্নাস্বামীর ভাগ্য বদলের গল্প

Share

বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম আবারও শিরোনামে। এক বছর আগে যেখানে বিরাট কোহলির নেতৃত্বাধীন রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর (আরসিবি) আইপিএল জয়ের উচ্ছ্বাস মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় রূপ নিয়েছিল, সেই একই মাঠ এবার আইপিএল ফাইনাল ও প্লে-অফ আয়োজনের সম্মান পেতে চলেছে।

যে স্টেডিয়াম নিয়ে কিছুদিন আগেও সংশয় ছিল—সেখানে আদৌ কোনও ম্যাচ হবে কি না—সেই ভেন্যুই এখন পেতে চলেছে মোট সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। ভাগ্যের পরিহাস হোক বা সময়ের পালাবদল, চিন্নাস্বামী আবারও প্রস্তুত ক্রিকেটের মহারণের জন্য।

কিছুদিন আগেও জল্পনা ছিল, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বেঙ্গালুরুর ঐতিহ্যবাহী এই স্টেডিয়ামে আইপিএলের একটি ম্যাচও নাও হতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। এখন শোনা যাচ্ছে, শুধু লিগ ম্যাচ নয়—আইপিএল ফাইনাল ২০২৫ এবং একটি প্লে-অফ ম্যাচও আয়োজিত হবে চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে।

সব মিলিয়ে কোটি টাকার এই টি-টোয়েন্টি লিগের সাতটি ম্যাচ পাবে আরসিবির হোম গ্রাউন্ড। ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে এটি নিঃসন্দেহে বড় খবর।

গত বছর আরসিবি আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর দলের উদযাপন অনুষ্ঠান ঘিরে স্টেডিয়ামের বাইরে ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় ১১ জন সমর্থকের মৃত্যু হয় এবং অন্তত ৪৭ জন আহত হন। আনন্দের মুহূর্ত মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকের আবহে।

এই দুর্ঘটনার পর কর্নাটক হাই কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্তের নির্দেশ দেয়। প্রশাসনিক দায় নিয়ে কর্নাটক সরকার ও কর্নাটক ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (কেসিএ) মধ্যে শুরু হয় চাপানউতোর। নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ এবং স্টেডিয়াম পরিচালনার বিভিন্ন ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর অবশেষে মাসখানেক আগে কর্নাটক সরকার চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামকে ম্যাচ আয়োজনের অনুমতি দেয়। তবে এই অনুমতির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় একাধিক কঠোর শর্ত।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, অতিরিক্ত প্রবেশ ও প্রস্থান পথ, উন্নত ভিড় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসা পরিষেবার পরিকাঠামো শক্তিশালী করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আয়োজক সংস্থা ও ফ্র্যাঞ্চাইজিকে লিখিতভাবে নিরাপত্তা সংক্রান্ত দায়িত্ব নিতে হয়।

আরসিবি ফ্র্যাঞ্চাইজি সমস্ত শর্ত মেনে নিয়েই নিজেদের হোম ম্যাচ চিন্নাস্বামীতে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর মাধ্যমে তারা স্পষ্ট বার্তা দেয়—ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও সুরক্ষিত পরিবেশে ক্রিকেট ফিরিয়ে আনাই তাদের লক্ষ্য।

পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় এর মধ্যেই আরসিবি একটি বিকল্প ভেন্যু চূড়ান্ত করে ফেলেছিল। ছত্তিশগড়ের বীর বাহাদুর সিং স্টেডিয়ামকে হোম ম্যাচের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু চিন্নাস্বামী সরকারি ছাড়পত্র পাওয়ার পর ফ্র্যাঞ্চাইজি দ্রুত সিদ্ধান্ত বদলায়। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাতটি হোম ম্যাচের মধ্যে পাঁচটি অনুষ্ঠিত হবে বেঙ্গালুরুতে। বাকি দুটি ম্যাচ আয়োজন করা হবে ছত্তিশগড়ে।

এই সিদ্ধান্ত শুধু কৌশলগত নয়, আবেগঘনও বটে। কারণ চিন্নাস্বামী শুধু একটি স্টেডিয়াম নয়—এটি আরসিবি সমর্থকদের আবেগ, ইতিহাস এবং গর্বের প্রতীক।

আইপিএলের নিয়ম অনুযায়ী, যে দল চ্যাম্পিয়ন হয়, পরবর্তী মরসুমে সেই দলের ঘরের মাঠেই ফাইনাল আয়োজন করা হয়। আরসিবি গত মরসুমে শিরোপা জেতায় এবার ফাইনাল আয়োজনের দায়িত্ব পাচ্ছে চিন্নাস্বামী।

ফাইনালের পাশাপাশি একটি প্লে-অফ ম্যাচও আয়োজন করা হবে এখানে। ফলে মোট সাতটি ম্যাচের মধ্যে পাঁচটি লিগ ম্যাচ, একটি প্লে-অফ এবং একটি ফাইনাল—সব মিলিয়ে চিন্নাস্বামী হয়ে উঠবে আইপিএল ২০২৫-এর অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।

আইপিএল ফাইনাল আয়োজন মানেই বিপুল আর্থিক প্রবাহ। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহণ, স্থানীয় ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই বাড়বে চাহিদা। বেঙ্গালুরুর অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এছাড়া ক্রিকেট পর্যটনের ক্ষেত্রেও এটি বড় সুযোগ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এবং বিদেশ থেকেও সমর্থকরা আসবেন ম্যাচ দেখতে। ফলে শহরের আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও দৃঢ় হবে।

গত বছরের দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আয়োজকরা এবার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। উন্নত সিসিটিভি নজরদারি, ডিজিটাল টিকিট যাচাই, আলাদা প্রবেশ ও প্রস্থান গেট এবং প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হবে।

ভিড় নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার পরিকল্পনাও তৈরি হয়েছে। আয়োজকদের দাবি, এবার কোনও ঝুঁকি নেওয়া হবে না।

চিন্নাস্বামী মানেই বিরাট কোহলির রাজত্ব। এই মাঠেই তিনি অসংখ্য স্মরণীয় ইনিংস খেলেছেন। সমর্থকদের গর্জনে মুখরিত এই স্টেডিয়াম আবারও সাক্ষী হতে চলেছে ২২ গজের উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ের।

এক বছর আগে যেখানে শোক নেমে এসেছিল, সেখানেই এবার নতুন আশার আলো। সমর্থকরাও চান, নিরাপদ পরিবেশে আবারও ক্রিকেট উৎসব উপভোগ করতে।

এক বছর আগে যে দিনটি বেঙ্গালুরুর জন্য অভিশপ্ত হয়ে উঠেছিল, সেটি ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। তবে সময় এগিয়ে যায়, আর খেলাধুলা মানুষকে নতুন করে একত্রিত করে।

চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম এখন শুধু একটি ভেন্যু নয়—এটি পুনর্জাগরণের প্রতীক। নিরাপত্তা, দায়িত্ববোধ এবং পরিকল্পনার সমন্বয়ে আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী মাঠ।

আইপিএল ফাইনাল ২০২৫ এবং প্লে-অফের মতো উচ্চমানের ম্যাচ আয়োজনের মাধ্যমে চিন্নাস্বামী প্রমাণ করতে চলেছে, কঠিন সময় পেরিয়েও ঘুরে দাঁড়ানো যায়। বেঙ্গালুরু প্রস্তুত, সমর্থকেরা প্রস্তুত—এবার অপেক্ষা শুধু ক্রিকেটের মহারণ শুরুর।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন