Homeবিশেষ প্রতিবেদনইরানের নতুন সুপ্রিম লিডারের প্রথম বার্তা: “হরমুজ প্রণালী বন্ধই থাকবে”

ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডারের প্রথম বার্তা: “হরমুজ প্রণালী বন্ধই থাকবে”

Share

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনেইয়ের প্রথম বার্তা ঘিরে। ক্ষমতায় বসেই তিনি যে কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছেন, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন তাঁর বক্তব্যে। দেশবাসীর উদ্দেশ্যে দেওয়া এই বার্তায় তিনি সরাসরি ঘোষণা করেছেন—হরমুজ প্রণালী বন্ধই থাকবে এবং এই সিদ্ধান্ত থেকে ইরান একচুলও সরে আসবে না।

বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তাঁর লিখিত বার্তা পাঠ করে শোনানো হয়। যদিও মোজতবা নিজে জনসমক্ষে আসেননি, তবুও তাঁর বার্তার ভাষা ছিল অত্যন্ত দৃঢ় ও যুদ্ধংদেহি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্দেশে তিনি যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল মোজতবা খামেনেইয়ের প্রথম আনুষ্ঠানিক বক্তব্য। তাঁর পিতা, সাবেক সুপ্রিম লিডার আলি খামেনেই যুদ্ধের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন বলে দাবি করা হয়। সেই ঘটনার পর ইরানের ক্ষমতার শীর্ষ পদে মোজতবাকেই নির্বাচিত করা হয়।

নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি এখনও প্রকাশ্যে খুব কমই এসেছেন। ফলে তাঁর প্রথম বার্তা নিয়ে দেশজুড়ে কৌতূহল ছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি হয়তো পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, তিনি আগের চেয়ে আরও কঠোর নীতি অনুসরণ করতে পারেন।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ হলো হরমুজ প্রণালী। মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানির বড় অংশই এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে যায়। তাই এই প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

মোজতবা খামেনেই তাঁর বার্তায় স্পষ্ট করে বলেন, ইরান এই প্রণালীকে নিজেদের কৌশলগত শক্তি হিসেবে ব্যবহার করবে। তাঁর কথায়, যুদ্ধের এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।

তিনি আরও বলেন, এই প্রণালী বন্ধ রাখা ইরানের প্রতিরক্ষামূলক কৌশলের অংশ। এর মাধ্যমে দেশটি শত্রুপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়।

শুধু হরমুজ প্রণালী নয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিয়েও কঠোর বার্তা দিয়েছেন নতুন সুপ্রিম লিডার। তাঁর দাবি, এই অঞ্চলে থাকা সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি দ্রুত বন্ধ করতে হবে।

তিনি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেন, যদি এই ঘাঁটিগুলো বন্ধ না করা হয়, তাহলে সেগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। তাঁর এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যদি পরিস্থিতি সামরিক সংঘর্ষের দিকে এগোয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু এই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

মোজতবা খামেনেই তাঁর বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইরান এই যুদ্ধে হওয়া ক্ষতির জন্য শত্রুদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করবে।

তাঁর মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যেসব হামলা হয়েছে, সেগুলোর দায় যেসব দেশ নিয়েছে বা সমর্থন দিয়েছে, তাদেরই এর মূল্য দিতে হবে।

এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ইরান শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানেই থাকবে না; বরং রাজনৈতিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে চায়।

মোজতবা খামেনেইয়ের বক্তব্যে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল করার ব্যাপারে তাঁর বিশেষ আগ্রহ নেই।

বিশ্বের অনেক দেশ চায় হরমুজ প্রণালী দ্রুত খুলে দেওয়া হোক, যাতে জ্বালানি সরবরাহে কোনও সমস্যা না হয়। কিন্তু ইরানের নতুন নেতৃত্ব এই চাপকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের তেলের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে যায়।

ইরানের রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে যে মোজতবা খামেনেইয়ের সঙ্গে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ।

এই বাহিনীই মূলত ইরানের শক্তিশালী সামরিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, মোজতবার নেতৃত্বে এই বাহিনীর প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

ফলে তাঁর দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়নে ইরানি সামরিক বাহিনী আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

মোজতবা খামেনেইয়ের প্রথম বার্তাই পরিষ্কার করে দিয়েছে যে তিনি আপসহীন নীতি অনুসরণ করতে পারেন। তাঁর বক্তব্যে যেমন যুদ্ধের ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনি কৌশলগত চাপ তৈরির পরিকল্পনাও দেখা যাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি নিয়ে হুঁশিয়ারি—এই দুই বিষয়ই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি কূটনৈতিক সমাধান দ্রুত না আসে, তাহলে এই উত্তেজনা বড় আকারের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। আর তা হলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়বে।

ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনেইয়ের প্রথম বক্তব্য ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন তুলেছে। এখন দেখার বিষয়, তাঁর এই কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতে কতটা বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পরিস্থিতির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। কারণ হরমুজ প্রণালী, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং জ্বালানি বাজার—এই তিনটি বিষয়ই বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরানের নতুন নেতৃত্বের অধীনে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ নতুন মোড় নিতে চলেছে। আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব কতটা গভীর হবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের বড় প্রশ্ন।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন