Homeবিশেষ প্রতিবেদনইরান বনাম আমেরিকা-ইজরায়েল: ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি, বন্ধ আকাশপথ, বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক!

ইরান বনাম আমেরিকা-ইজরায়েল: ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি, বন্ধ আকাশপথ, বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক!

Share

পশ্চিম এশিয়ায় পরিস্থিতি যেন প্রতি ঘণ্টায় বদলে যাচ্ছে। ইজ়রায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলার জবাবে ইরান একের পর এক পাল্টা আঘাত হানছে। তৃতীয় দিনে এসে সংঘাত শুধু দুই-তিন দেশের মধ্যে নেই—গোটা অঞ্চলই অস্থির। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, যুদ্ধবিমান, পরমাণুকেন্দ্র, কূটনৈতিক ফোনালাপ—সব মিলিয়ে এক জটিল যুদ্ধচিত্র তৈরি হয়েছে। চলুন ধীরে ধীরে বোঝার চেষ্টা করি, এই কয়েক দিনে ঠিক কী কী ঘটল এবং এর প্রভাব কতদূর ছড়িয়ে পড়ল।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই মার্কিন হামলায় নিহত হওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। তাঁর স্ত্রী খোজাস্তেহ বাঘেরজ়াদেহ গুরুতর আহত হয়েছিলেন। কয়েক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে তিনিও মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল ৭৮। ১৯৬৪ সালে তাঁদের বিয়ে হয়, যখন খামেনেই এখনও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হননি।

খোজাস্তেহর পারিবারিক শিকড়ও ছিল রাজনৈতিক। তাঁর বাবা ছিলেন আয়াতোল্লা রুহুল্লা খোমেইনি-র ঘনিষ্ঠ সহযোগী। খোমেইনির নেতৃত্বেই সত্তরের দশকের শেষে ইরানে ইসলামিক বিপ্লব ঘটে এবং শাহ শাসনের পতন হয়। ফলে এই মৃত্যু শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, রাজনৈতিক প্রতীকও বটে।

খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর ইরান নিজেদের ‘প্রতিশোধের’ ভাষায় অবস্থান স্পষ্ট করেছে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় পাল্টা আক্রমণের ঝড়।

ইরান শুধু ইজ়রায়েল বা আমেরিকাকেই নিশানা করেনি। এবার আঘাত হেনেছে সৌদি আরবেও। রাস টানুরা শহরে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা Saudi Aramco-র স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।

তেলের বাজারে সৌদি আরবের ভূমিকা কতটা বড়, সেটা আমরা সবাই জানি। ফলে এই হামলা সরাসরি বিশ্ববাজারে চাপ ফেলেছে। রিয়াধ সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টা আঘাতের ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলেছে, দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত এলে চুপ করে থাকবে না।

একটা তেল শোধনাগারে হামলা মানে শুধু একটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নয়। এর মানে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামে প্রভাব পড়া। পেট্রোলের দাম বাড়লে তার ধাক্কা সাধারণ মানুষের পকেটেই আগে লাগে—এটাই বাস্তব।

সোমবার ভোরে একটি বড় ঘটনা সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৫ ‘স্ট্রাইক ঈগল’ যুদ্ধবিমান কুয়েতের কাছে ভেঙে পড়ে। প্রথমে ইরানের কিছু সংবাদমাধ্যম দাবি করে, তাদের ড্রোন গুলি করে নামিয়েছে বিমানটি।

কিন্তু পরে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, সম্ভবত তাদের নিজেদের ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভুল করে সেটিকে শত্রু ভেবে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। মানে একপ্রকার ‘বন্ধুত্বপূর্ণ গোলাবর্ষণ’।

পাইলট প্যারাস্যুটে নিরাপদে নেমে এলেও ঘটনাটি বড় প্রশ্ন তুলেছে—এত বড় সামরিক শক্তির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব কেন? যুদ্ধক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্তের দাম যে কত বড় হতে পারে, এই ঘটনা তারই উদাহরণ।

সাইপ্রাসের আক্রোতিরি ঘাঁটিতে ব্রিটিশ বাহিনীর উপর ড্রোন হামলার খবরও মিলেছে। দুটি ড্রোনের একটি ভূপাতিত হলেও অন্যটি রানওয়েতে আছড়ে পড়ে। ব্রিটেন এখনও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব দেয়নি।

এতে বোঝা যাচ্ছে, সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ন্যাটো-সহযোগী দেশগুলিও সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছে।

ইরান দাবি করেছে, তাদের নাতানজ় পরমাণুকেন্দ্র যৌথ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বলেছে, এখনো বড় ক্ষতির প্রমাণ মেলেনি।

আল জাজিরার খবরে ইশফাহান কেন্দ্রের আশপাশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পরমাণুকেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ স্বাভাবিকভাবেই বেশি। কারণ এখানে বড় দুর্ঘটনা মানে শুধু সামরিক ক্ষতি নয়, পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের জীবনের জন্যও ভয়াবহ বিপদ।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থানও নজরে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফোনে কথা বলেছেন সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং বাহরিনের রাজা হামাদ বিন ইসা আল খলিফা-র সঙ্গে।

ভারত প্রকাশ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নিন্দা করেছে। তবে ইরানের উপর ইজ়রায়েল-আমেরিকার আক্রমণ নিয়ে দিল্লি সরাসরি মন্তব্য করেনি। অনেকেই মনে করছেন, ভারত কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করতে চাইছে—একদিকে জ্বালানি ও প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক।

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, বাহরিন, জর্ডন—একাধিক দেশ আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। ফলাফল? হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল।

দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শত শত উড়ান ও অবতরণ বাতিল হয়েছে। অনেক যাত্রী বিমানবন্দর বা হোটেলে আটকে পড়েছেন। ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত। ইন্ডিগো ও এয়ার ইন্ডিয়া একাধিক ফ্লাইট বাতিল করেছে।

ভাবুন তো, কেউ হয়তো চিকিৎসার জন্য যাচ্ছিলেন, কেউ কাজের জন্য, কেউ পরিবারের কাছে ফিরছিলেন—হঠাৎ সব থমকে গেল। যুদ্ধের সরাসরি ধাক্কা এভাবেই সাধারণ মানুষের জীবনে এসে পড়ে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর ইরানবিরোধী সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই মতভেদ তীব্র। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চার জনের মধ্যে মাত্র একজন এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন।

অনেকে মনে করছেন, ট্রাম্প অতিরিক্ত আগ্রাসী নীতি নিচ্ছেন। আবার তাঁর সমর্থকেরা বলছেন, কঠোর অবস্থানই একমাত্র পথ।

যুদ্ধ মানে শুধু সীমান্তে গোলাগুলি নয়। দেশের ভেতরেও রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়। তেলের দাম বাড়ে, অর্থনীতি চাপে পড়ে, সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন হয়।

এই মুহূর্তে পশ্চিম এশিয়ার আকাশে অনিশ্চয়তার মেঘ। পরমাণুকেন্দ্র, তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি—সবই ঝুঁকির মুখে। কূটনৈতিক ফোনালাপ চলছে, আবার একই সঙ্গে ড্রোনও উড়ছে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই সংঘাত কি সীমিত থাকবে, নাকি আরও দেশ জড়িয়ে পড়ে বড় আকার নেবে?

একটা কথা পরিষ্কার। এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু মানচিত্রের এক কোণে আটকে থাকবে না। জ্বালানির দাম থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি—সব জায়গাতেই তার ঢেউ লাগবে। আর শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভুগবে সাধারণ মানুষই।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন