বিশ্ব রাজনীতি এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের নয়—জ্বালানি আর ইন্টারনেটও হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় শক্তি।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী আর বাব এল-মান্ডেব প্রণালী—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ পথকে ঘিরে নতুন করে ভয় তৈরি হয়েছে। অনেকেই ভাবছে, যদি এই পথগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কি সত্যিই আমাদের দৈনন্দিন জীবন থমকে যাবে?চল একটু সহজভাবে বুঝি।
ইরান-এর পাশে থাকা হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবহন হয়। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যায়।ভাবো, এটা যেন একটা হাইওয়ে। এই রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে যেমন গাড়ি আটকে যায়, তেমনই তেল সরবরাহও থেমে যাবে।
তখন কী হবে?খুব সহজ—পেট্রোল, ডিজেল, গ্যাস—সবকিছুর দাম হঠাৎ বেড়ে যাবে। বাজারে জিনিসপত্রের দামও লাফিয়ে বাড়বে। মানে সরাসরি প্রভাব পড়বে তোমার-আমার জীবনে।এবার আসল চিন্তার জায়গা। আমরা সবাই ইন্টারনেট ছাড়া একদিনও চলতে পারি না—ফেসবুক, ইউটিউব, অফিসের কাজ, ব্যাংকিং—সবই এর ওপর নির্ভরশীল।
এই ইন্টারনেট কিন্তু আকাশ দিয়ে নয়, মূলত সমুদ্রের নিচ দিয়ে যায়। বড় বড় ফাইবার অপটিক কেবল দিয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ডেটা যায়।হরমুজ প্রণালীর নিচ দিয়েও এমন অনেক Falcon, andপূর্ণ কেবল গেছে। যেমন AE-1, Falcon, Tata TGN Gulf—এসব কেবল ভারতসহ অনেক দেশের ইন্টারনেট সংযোগ চালু রাখে।তখন হঠাৎ করে ইন্টারনেট স্লো হয়ে যাবে, অনেক জায়গায় পুরো বন্ধও হয়ে যেতে পারে।
ব্যাংকিং সিস্টেম, ফ্লাইট, অনলাইন ব্যবসা—সবকিছুতেই সমস্যা হবে।এখন আসি বাব এল-মান্ডেব প্রণালী-এর কথাএখানই জায়গাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া আর আফ্রিকার মধ্যে ইন্টারনেট ডেটার বড় অংশ আদান-প্রদান হয়।শুধু তাই না, লোহিত সাগরের এই পথ দিয়ে ১৭টির বেশি সাবমেরিন কেবল গেছে।হাউথি গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তারা এই এলাকায় হামলা চালাতে পারে।
যদি সত্যিই এমন কিছু ঘটে, তাহলে শুধু একটি দেশ নয়—পুরো বিশ্বের ইন্টারনেট সংযোগ ঝুঁকিতে পড়বে।অনেকে ভাবেন, যুদ্ধ মানেই শুধু মিসাইল আর বন্দুক। কিন্তু বাস্তবে এখন যুদ্ধ অনেক বেশি কৌশলী।ইরান বুঝে গেছেেররাসরি শক্তিতে তারা হয়তো যুক্তরাষ্ট্র বা ইজরায়েল-এর মতো নয়। কিন্তু তারা জানে, কোথায় আঘাত করলে পুরো বিশ্ব কেঁপে উঠবে।
তাই তারা টার্গেট করছে তেল শোধনাগার, গ্যাস ফিল্ড, আর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।সম্প্রতি কাতারের একটি বড় গ্যাস ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে তারা সেটা প্রমাণও করেছে। যদিও ক্ষয়ক্ষতির পুরো হিসাব এখনো পরিষ্কার না, কিন্তু বার্তাটা স্পষ্ট—জ্বালানি আর ইন্টারনেট, এই দুই জায়গায় আঘাত করলে বিশ্ব থেমে যেতে পারে।ধরো, তুমি একটা অনলাইন ব্যবসা করো।
হঠাৎ ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেল। তুমি অর্ডার নিতে পারছ না, পেমেন্ট আসছে না।একইভাবে, ব্যাংক লেনদেন বন্ধ হলে অর্থনীতি থমকে যাবে। বিমান চলাচল ব্যাহত হবে। হাসপাতালের ডিজিটাল সিস্টেমও সমস্যায় পড়বে।
মানে, আধুনিক জীবনের প্রায় সবকিছুই ইন্টারনেটের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।তাই এই সাবমেরিন কেবলগুলোকে বলা হয় “সভ্যতার ধমনী”।এই পুরো পরিস্থিতিতে বিশ্ব রাজনীতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই সতর্ক করে দিয়েছেন, কাতারে আবার হামলা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু ইরান এই হুঁশিয়ারিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না।বরং তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।এদিকে রাশিয়া, চীন, ভারতসহ অনেক দেশ শান্তির আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কেউই পিছু হটতে রাজি নয়।ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এই কেবলগুলোর ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
যদি হরমুজ বা বাব এল-মান্ডেবের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে এখানে ইন্টারনেট স্পিড কমে যাবে বা বড় ধরনের বিভ্রাট দেখা দিতে পারে।বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।মানে, তুমি হয়তো ইউটিউব খুলে দেখছ ভিডিও লোড হচ্ছে না—এর পেছনে কারণ হতে পারে হাজার কিলোমিটার দূরের কোনো সমুদ্রের নিচে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
একদম পুরোপুরি থেমে যাবে—এটা হয়তো না। কারণ বিকল্প কেবল, স্যাটেলাইট—এগুলোও আছে।কিন্তু বড় ধরনের ধাক্কা যে লাগবে, সেটা নিশ্চিত।আমাদের জীবন এখন এতটাই সংযুক্ত—তেল, ইন্টারনেট, ডেটা—সব একে অপরের সঙ্গে জড়িত।
তাই এই দুই প্রণালীতে বড় ধরনের সমস্যা হলে, সেটা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—প্রভাব পড়বে আমাদের প্রতিদিনের জীবনে।এক কথায়, আধুনিক পৃথিবী যত উন্নত হয়েছে, ততটাই ভঙ্গুরও হয়ে উঠেছে।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

