বাংলাদেশের জন্য ২১ ফেব্রুয়ারি শুধুই একটি সাধারণ দিন নয়। এটি আমাদের ভাষা শহীদদের স্মৃতিতে উদযাপিত ‘শহীদ দিবস’ এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষার মর্যাদা রক্ষায় অনন্য ইতিহাসের দিন।
কিন্তু ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকায় এই দিনের অবস্থান নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যা নেওয়া হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর বৈঠকে।
ওই বৈঠকের পরে সংবাদমাধ্যমে বৈঠকের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানানো হয় সরকারের তরফে। কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারি যে সরকারি ছুটির দিনের মধ্যে পরিগণিত হবে না, তা এমন কোনও সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়নি।
২১ ফেব্রুয়ারি: শহীদ দিবসের তাৎপর্য
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষার্থীরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। পুলিশি গুলিতে প্রাণ হারান বরকত, সালাম, রফিক, জব্বরসহ আরও অনেক ভাষা শহীদ। এই আন্দোলন স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ বপনের ইতিহাসের অংশ। সেই থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি দেশে পালিত হয়ে আসছে শহীদ দিবস হিসেবে।
এ ছাড়াও, ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি শুধুমাত্র বাংলাদেশের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার প্রতীক।
২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকায় বৈপরীত্য
২০২৫ সালের শেষে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার নতুন বছরের সরকারি ছুটির তালিকা প্রকাশ করলে দেখা যায়, ২১ ফেব্রুয়ারির কোনো উল্লেখ নেই। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় দ্রুত। অনেকের ধারণা, সরকার ভাষা আন্দোলনের গুরুত্বকে অগ্রাহ্য করছে। অন্যদিকে সরকারের সমর্থকরা বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে শনিবার পড়েছে। বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটির দিন সাধারণত শুক্রবার ও শনিবার। তাই আলাদা ছুটির প্রয়োজন হয়নি।
তবে ইতিহাসবিদ এবং অনেকে মনে করান, তাৎপর্যপূর্ণ দিনের সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটির মিল থাকলেও সরকারি ছুটির তালিকায় তা উল্লেখ করা উচিত। অতীতে এমন মিল থাকলেও বিশেষ দিনের মর্যাদা রক্ষায় ছুটি ঘোষণা করা হতো।
অতীতের ছুটির ধারা
বাংলাদেশের ছুটির ইতিহাসে দেখা যায়, প্রাথমিক সময়ে রবিবারই একমাত্র সাপ্তাহিক ছুটি ছিল। জিয়াউর রহমানের আমলে বিশেষ সময়ে শনিবারও যুক্ত হয়েছিল। এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে শুক্রবার সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। শেখ হাসিনার আমলে তা পরিবর্তিত হয়ে শুক্র ও শনিবার দু’দিন সরকারি ছুটি হিসেবে ধরা হয়।
এবার ইউনূস সরকারের আমলে ২১ ফেব্রুয়ারির উল্লেখ বাদ পড়ায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনিক মহল জানাচ্ছে, সরকারি ছুটির দিন মন্ত্রিসভার বৈঠকে নির্ধারিত হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মণ্ডলীর বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিক সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি যে, ২১ ফেব্রুয়ারি এবার সরকারি ছুটি হবে না।
নির্বাচনও আলোচনার পেছনে
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচন এবং ফলাফলের আগে এই ধরনের বিতর্ক রাজনৈতিক এবং সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কেউ মনে করছে, ভোটের আগে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে।
জনগণের প্রতিক্রিয়া
সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই বলছেন, শহীদ দিবসের মর্যাদা ন্যায্যভাবে রক্ষা করা উচিত। সরকারি ছুটি না থাকলে তা ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে আঘাত করতে পারে। অনেকে আবার যুক্তি দিচ্ছেন, সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিল থাকায় অতিরিক্ত ছুটির প্রয়োজন নেই।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

