Homeমেডিকেল জার্নালচিকিৎসা বিজ্ঞানে ইতিহাস! কৃত্রিম ফুসফুসে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরলেন মরণাপন্ন রোগী

চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইতিহাস! কৃত্রিম ফুসফুসে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরলেন মরণাপন্ন রোগী

Share

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা শুধু একটি প্রাণ বাঁচায় না, বরং গোটা বিশ্বের চিকিৎসা ভাবনাকে বদলে দেয়। ঠিক তেমনই এক যুগান্তকারী সাফল্য এনে দিল ‘কৃত্রিম ফুসফুস’। ফুসফুস সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যাওয়ার পরেও এক মরণাপন্ন রোগীকে টানা ৪৮ ঘণ্টা বাঁচিয়ে রাখলেন চিকিৎসকেরা। অবিশ্বাস্য এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছেন ভারতীয় চিকিৎসক অঙ্কিত ভরত। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির এই নতুন দিগন্ত ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলেছে বিশ্বজুড়ে।

ফুসফুস সম্পূর্ণ অকেজো, তবু বেঁচে থাকার লড়াই

ঘটনাটি আমেরিকার শিকাগো শহরের নর্থওয়েস্টার্ন মেডিসিন হাসপাতালে। বছর তেত্রিশের এক যুবক ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হন। শুরুতে সাধারণ জ্বর-কাশি মনে হলেও দ্রুত পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ভাইরাস সংক্রমণ এতটাই মারাত্মক আকার নেয় যে, তিনি আক্রান্ত হন ‘অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম’-এ। ফুসফুসে তীব্র প্রদাহ শুরু হয়। শ্বাস নেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এর মধ্যেই নতুন করে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন ওই যুবক। ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়ার যুগপৎ আক্রমণে ফুসফুস সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়। শরীর আর অক্সিজেন নিতে পারছিল না। এমন অবস্থায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে সাধারণত একমাত্র পথ হল ফুসফুস প্রতিস্থাপন। কিন্তু এখানেই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা।

কেন তখনই ফুসফুস প্রতিস্থাপন সম্ভব ছিল না

চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, রোগীর ফুসফুস তখন জল ও শ্লেষ্মায় ভর্তি ছিল। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ভয়ংকর ভাবে কমে যাচ্ছিল। তাঁকে একমো সাপোর্টে রাখা হয়। একমো বা এক্সট্রাকর্পোরিয়াল মেমব্রেন অক্সিজেনেশন পদ্ধতিতে যন্ত্রের মাধ্যমে রক্তে অক্সিজেন ঢোকানো হয় এবং কার্বন ডাই অক্সাইড বের করা হয়।

কিন্তু সমস্যা এখানেই শেষ হয়নি। ১০০ শতাংশ অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়েও শরীরের কোষে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছচ্ছিল না। হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা দেখা দেয়। কিডনিও বিকল হওয়ার পথে ছিল। এই অবস্থায় দ্রুত ফুসফুস প্রতিস্থাপন দরকার হলেও সংক্রমণ সক্রিয় থাকায় তা করা ছিল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। দাতার ফুসফুস প্রতিস্থাপন করলে সেটিও সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল প্রবল।

তাই চিকিৎসকদের সামনে প্রশ্ন ছিল একটাই—সংক্রমণ না কমা পর্যন্ত রোগীকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যাবে?

জন্ম নিল কৃত্রিম ফুসফুসের ভাবনা

এই অসম্ভব পরিস্থিতিতেই নতুন পথ খুঁজে পান ভারতীয় চিকিৎসক অঙ্কিত ভরত এবং তাঁর দল। তাঁদের ভাবনা ছিল এমন একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করা, যা অস্থায়ী ভাবে ফুসফুসের কাজ করতে পারবে। ঠিক সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘কৃত্রিম ফুসফুস’।

এই কৃত্রিম ফুসফুস মূলত হার্ট ও ফুসফুসের মাঝখানে যুক্ত করা হয়। এটি এমনভাবে তৈরি যে, হৃদ্‌যন্ত্র থেকে বের হওয়া রক্ত এতে প্রবেশ করে, সেখানে অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড ছেড়ে আবার হৃদ্‌যন্ত্রে ফিরে যায়। ঠিক যেমনটা স্বাভাবিক ফুসফুস করে থাকে।

কীভাবে কাজ করে কৃত্রিম ফুসফুস

এই যান্ত্রিক ফুসফুস শরীরের স্বাভাবিক রক্ত চলাচল বজায় রাখে। কোনও আলাদা পাম্পের প্রয়োজন হয় না। হৃদ্‌যন্ত্রের নিজস্ব শক্তিতেই রক্ত চলাচল করে। এর ফলে শরীরের প্রতিটি কোষে পৌঁছে যায় প্রয়োজনীয় অক্সিজেন।

চিকিৎসকদের দাবি, ভেন্টিলেশন বা একমো সাপোর্ট যখন আর কাজ করে না, তখন এই কৃত্রিম ফুসফুস কার্যকর বিকল্প হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, এতে শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাও অনেক কম।

এই প্রযুক্তির সাহায্যেই রোগী টানা ৪৮ ঘণ্টা ফুসফুস ছাড়াই স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস চালিয়ে যান। এই সময়ের মধ্যেই তাঁর সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে।

৪৮ ঘণ্টার লড়াই শেষে নতুন জীবন

দু’দিন পর পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে চিকিৎসকেরা ফুসফুস প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সংক্রমণ কমে যাওয়ায় ঝুঁকিও অনেকটাই হ্রাস পায়। সফল ভাবে সম্পন্ন হয় প্রতিস্থাপন। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন রোগী।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই ঘটনা এক অনন্য নজির। কারণ এর আগে কখনও সম্পূর্ণ বিকল ফুসফুস ছাড়া এত দীর্ঘ সময় কোনও মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।

ভারতীয় চিকিৎসক অঙ্কিত ভরত ও তাঁর অবদান

এই সাফল্যের নেপথ্যে যিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তিনি হলেন ভারতীয় চিকিৎসক অঙ্কিত ভরত। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও তিনি সফল ফুসফুস প্রতিস্থাপন করে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনায় এসেছিলেন। গুরুতর সংক্রমণের মধ্যেও কীভাবে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা যায়, সেই বিষয়ে তাঁর গবেষণা নতুন নয়।

কৃত্রিম ফুসফুসের এই উদ্ভাবন তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণার ফল। চিকিৎসা প্রযুক্তিকে আরও নিরাপদ ও কার্যকর করার লক্ষ্যে তিনি এবং তাঁর দল নিরলস কাজ করে চলেছেন।

ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কী বদল আনতে পারে এই আবিষ্কার

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম ফুসফুস চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারে। বিশেষ করে সেই সব রোগীর ক্ষেত্রে, যাঁদের ফুসফুস হঠাৎ বিকল হয়ে যায় কিন্তু তাৎক্ষণিক প্রতিস্থাপন সম্ভব নয়, তাঁদের জন্য এটি হতে পারে জীবনদায়ী সেতু।

এখনও এই প্রযুক্তি পরীক্ষামূলক স্তরে রয়েছে। সঙ্কটাপন্ন রোগীদের উপর এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়েছে। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ভবিষ্যতে এটি নিয়মিত চিকিৎসা পদ্ধতির অংশ হয়ে উঠতে পারে।

মানবদেহ ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন

এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রযুক্তির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের শরীর যখন হাল ছেড়ে দেয়, তখন সঠিক সময়ে সঠিক প্রযুক্তিই ফিরিয়ে দিতে পারে প্রাণ।

একজন মানুষের বেঁচে থাকার পেছনে শুধু ওষুধ নয়, কাজ করে বিজ্ঞানীদের সাহসী চিন্তা ও নতুন কিছু করার মানসিকতা। কৃত্রিম ফুসফুস তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।

শেষ কথা

ফুসফুস ছাড়াই ৪৮ ঘণ্টা বেঁচে থাকা কোনও কল্পকাহিনি নয়, বাস্তব ঘটনা। ভারতীয় চিকিৎসক অঙ্কিত ভরত ও তাঁর দলের হাত ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে তৈরি হল এক নতুন দিগন্ত। এই কৃত্রিম ফুসফুস ভবিষ্যতে অসংখ্য প্রাণ বাঁচাতে পারে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মানুষের জীবন রক্ষায় বিজ্ঞান যে এখনও থেমে নেই, এই আবিষ্কার তারই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন