চুয়াডাঙ্গায় শীত যেন হঠাৎ করেই আরও কড়া রূপ নিয়েছে। হিমশীতল বাতাস আর ঘন কুয়াশার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাপমাত্রা নেমে এসেছে মৌসুমের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকাল ছয়টায় জেলায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে মাত্র ৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি শীত মৌসুমে এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন।
শুরু হয়েছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ
চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, জেলার ওপর দিয়ে এখন মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। সিনিয়র পর্যবেক্ষক জাহিদুল ইসলাম জানান, গত কয়েক দিন ধরে এখানে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ চলছিল। তখন তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রির মধ্যে ঘোরাফেরা করছিল। তবে মঙ্গলবার সকালে এক ধাক্কায় তাপমাত্রা আরও কমে ৭.৫ ডিগ্রিতে নেমে আসে। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা ১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যাওয়ায় শীতের তীব্রতা হঠাৎ বেড়ে গেছে।
ঘন কুয়াশা ও আর্দ্রতা বাড়াচ্ছে শীতের অনুভূতি
শুধু তাপমাত্রা কমলেই শীত বাড়ে না, সেটাই এখন টের পাচ্ছেন চুয়াডাঙ্গার মানুষ। মঙ্গলবার সকালে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৩ শতাংশ। এই বেশি আর্দ্রতার কারণে ঘন কুয়াশা তৈরি হয়েছে এবং ঠান্ডার অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। হিমশীতল বাতাস শরীরে এমনভাবে বিঁধছে যে গরম কাপড় পরেও অনেকেই স্বস্তি পাচ্ছেন না।
খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ চরমে
মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন খেটে খাওয়া ও ছিন্নমূল মানুষ। ভোরবেলা কাজে বের হওয়া এখন অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রয়োজন ছাড়া সাধারণ মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। যারা বের হচ্ছেন, তাদের মুখে একটাই কথা—এমন শীত অনেক দিন পর দেখছেন।
সন্ধ্যার পর থেকেই শীতের দাপট
পথচারী মঙ্গল মিয়া জানান, সন্ধ্যা নামার পর থেকেই শীত যেন আরও ধারালো হয়ে যায়। তার ভাষায়, এই শীত মুখে বলে বোঝানো যায় না। ঘরের ভেতরেও শীত, বাইরেও শীত—কোথাও স্বস্তি নেই। একই কথা বলছেন ভ্যানচালক রশিদ মোল্লাও। তিনি জানান, একের পর এক শীতের কাপড় পরেও শরীর গরম রাখা যাচ্ছে না। শরীরের সামান্য অংশ খোলা থাকলেই তীব্র ঠান্ডা লেগে যাচ্ছে। শীতের কারণে সকাল থেকে রাস্তায় বের হলেও যাত্রী কম, আয়ও কমে গেছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি কষ্ট
এই শীত শিক্ষার্থীদের জীবনেও বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থী আব্দুল হালিম বলেন, সকালে পানিতে হাত দেওয়াই এখন কষ্টকর। বরফের মতো ঠান্ডা পানি ব্যবহার করে পড়াশোনার জন্য বের হওয়া সত্যিই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থীই ভোরের ক্লাস বা প্রাইভেট পড়াতে যেতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছে।
বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা
শীতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে স্বাস্থ্য খাতেও। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টের রোগীও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
সামনে আরও শীতের আশঙ্কা
আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আপাতত তাপমাত্রা খুব দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা নেই। বরং আগামী কয়েক দিন শীতের এই তীব্রতা অব্যাহত থাকতে পারে। ঘন কুয়াশার কারণে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কম থাকায় শীত আরও বেশি অনুভূত হবে।
সতর্ক থাকার পরামর্শ
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন। গরম কাপড় ব্যবহার, ঠান্ডা বাতাস এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই এখন সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চুয়াডাঙ্গায় শীত এখন আর শুধু অনুভূতির বিষয় নয়, এটি প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় স্পষ্ট প্রভাব ফেলছে। সামনে শীত আরও বাড়লে এই দুর্ভোগ যে আরও তীব্র হবে, সেটাই এখন সবার আশঙ্কা।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
