আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, হালকা গুনগুন করা বা মন খুলে গান গাওয়া শুধু মন ভালো করার জন্য নয়, বরং শরীরের জন্যও কতটা কাজের? আমরা অনেকেই গানকে শুধু বিনোদন হিসেবেই দেখি। কিন্তু গবেষণা বলছে, গান গাওয়া আসলে মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে হৃদ্যন্ত্র, ফুসফুস এমনকি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপরও দারুণ প্রভাব ফেলে।
বাসে বসে আপন মনে গুনগুন করা হোক বা বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে গান—এই ছোট অভ্যাসটাই আপনার ভেতরে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
গান গাওয়ার সময় আমরা নিজের অজান্তেই মনের ভেতরের আবেগগুলো বাইরে এনে ফেলি। আনন্দ, দুঃখ, উত্তেজনা—সবকিছুরই একটা পথ খুঁজে পায় কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে। তাই গান গাইলে হালকা লাগে। মন যেন একটু খোলা হাওয়া পায়।
মনোবিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, একসঙ্গে গান গাওয়ার সময় মানুষের মধ্যে অদ্ভুত রকমের সংযোগ তৈরি হয়। আগে একে অপরকে না চেনা মানুষও গান শেষে কাছের মানুষ হয়ে ওঠে। ভাবুন তো, এক ঘণ্টা একসঙ্গে গান গেয়ে বের হওয়ার পর মনে হয় যেন বহুদিনের চেনা।
একাই গান গাওয়া ভালো। কিন্তু দলবেঁধে বা কোরাসে গান গাওয়ার উপকার আরও বেশি। কারণ তখন শুধু কণ্ঠ নয়, মনও একসঙ্গে কাজ করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দলীয় গান মানসিক চাপ কমায়, একাকিত্ব দূর করে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি আরও স্পষ্ট। একসঙ্গে গান গাইলে তাদের ভাষার দক্ষতা বাড়ে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখে এবং সহযোগিতার মানসিকতা তৈরি হয়।
স্কুলে নামতা বা ছড়া গান করে শেখার কথাটা ভাবুন। কত সহজেই মনে থাকে, তাই না?
গান গাওয়ার সময় মস্তিষ্কের দুই পাশই সক্রিয় হয়। ভাষা, স্মৃতি, নড়াচড়া আর আবেগ—সব একসঙ্গে কাজ শুরু করে। এজন্যই গান গাওয়া মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এত শক্তিশালী।
গবেষক অ্যালেক্স স্ট্রিট বলেন, গান গাওয়া একসাথে জ্ঞানগত, আবেগীয়, শারীরিক ও সামাজিক কাজ। সহজ কথায়, এটা পুরো মানুষটাকেই কাজে লাগায়।
এই কারণেই গান গাওয়া মানসিক চাপ কমাতে এত কার্যকর। নিয়মিত গান গাইলে উদ্বেগ কমে, মন শান্ত থাকে এবং মনোযোগ বাড়ে।
গান গাওয়ার সময় আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস হয় ধীর ও গভীর। এতে হৃদ্স্পন্দন ও রক্তচাপের উন্নতি ঘটে। শরীরে এন্ডরফিন নামের হরমোন নিঃসৃত হয়, যাকে আমরা “ভালো লাগার হরমোন” বলি।
এই হরমোন ব্যথা কমায়, মন ভালো করে এবং শরীরকে রোগের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে। তবে এখানে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এই উপকার সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় দলবদ্ধ গান গাওয়ার মাধ্যমে, শুধু গান শুনলে নয়।
গান গাওয়া ফুসফুসের জন্য এক ধরনের প্রাকৃতিক ব্যায়াম। দীর্ঘ ও নিয়ন্ত্রিত শ্বাস নেওয়ার ফলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়ে।
এই কারণেই অনেক গবেষক হাঁপানি, সিওপিডি বা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষদের জন্য গান গাওয়ার পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। এতে শ্বাসের ছন্দ ঠিক হয় এবং কষ্ট কিছুটা কমে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষণায় দেখা গেছে, লং কোভিডে আক্রান্ত কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ছয় সপ্তাহের গানভিত্তিক শ্বাসপ্রশ্বাস প্রশিক্ষণ শ্বাসকষ্ট কমাতে সাহায্য করেছে।
শুনতে অবাক লাগলেও গান গাওয়া আসলে হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামের মতোই কাজ করে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত কণ্ঠচর্চা করেন, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট।
গবেষণায় দেখা গেছে, গায়কদের কণ্ঠচর্চা হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের জন্য মাঝারি গতিতে হাঁটার সমান উপকার দিতে পারে। মানে, আপনি যদি গান ভালোবাসেন, তাহলে সেটাই হতে পারে আপনার ব্যায়াম।
গান গাওয়ার সবচেয়ে আশ্চর্য দিক হলো—এটি মস্তিষ্কের ক্ষতি থেকে সেরে উঠতেও সাহায্য করতে পারে।
স্ট্রোক, পারকিনসন্স, ডিমেনশিয়া বা মস্তিষ্কে আঘাত পাওয়া রোগীদের নিয়ে কাজ করছেন গবেষকেরা। দেখা গেছে, গান গাওয়ার মাধ্যমে অনেক রোগী কথা বলার ক্ষমতা বা স্মৃতিশক্তি কিছুটা হলেও ফিরে পাচ্ছেন।
২০১১ সালে মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়া মার্কিন কংগ্রেসওম্যান গ্যাব্রিয়েল গিফোর্ডসের উদাহরণ খুবই পরিচিত। থেরাপিস্টরা তার শৈশবের গান ব্যবহার করে ধীরে ধীরে তার কথা বলার সাবলীলতা ফিরিয়ে আনেন।
কারণ গান গাওয়া মস্তিষ্কে নতুন সংযোগ তৈরি করে। একে বলা হয় নিউরোপ্লাস্টিসিটি। সহজ করে বললে, মস্তিষ্ক নিজেকে নতুনভাবে গড়ার সুযোগ পায়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতি দুর্বল হওয়া স্বাভাবিক। তবে গান গাওয়া এই প্রক্রিয়াকে ধীর করতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।
গান গাওয়ার সময় দীর্ঘ মনোযোগ লাগে, শব্দ মনে করতে হয় এবং স্মৃতি ব্যবহার করতে হয়। এসব কারণে বয়স্কদের মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে।
যদিও বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না গান ডিমেনশিয়া পুরোপুরি ঠেকাতে পারে কি না, তবে মানসিক সুস্থতায় এর ভূমিকা যে বড়, তা প্রমাণিত।
সব ভালো জিনিসের মতো গান গাওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু সতর্কতা দরকার। কোভিড-১৯ মহামারির সময় দেখা গেছে, দলবদ্ধ গান গাওয়ার মাধ্যমে ভাইরাস দ্রুত ছড়াতে পারে।
আপনার যদি শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ থাকে, তাহলে কিছুদিন দলীয় গান এড়িয়ে চলাই ভালো। নিজের ও অন্যের নিরাপত্তা সবার আগে।
গবেষকদের মতে, মানুষ কথা বলার আগেই গান গাইতে শিখেছিল। অনুভূতি প্রকাশ, সামাজিক বন্ধন আর আচার-অনুষ্ঠানে গান ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের জীবনে গান জড়িয়ে থাকে। শিশুকে ঘুম পাড়ানো থেকে শুরু করে শোকের মুহূর্ত—সব জায়গায় গান।
আজকের ব্যস্ত আর প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে আমরা হয়তো একসঙ্গে গান গাওয়ার সুযোগ কম পাচ্ছি। কিন্তু সুযোগ পেলেই গাইলে শরীর আর মন দুটোই কৃতজ্ঞ থাকবে।
তাই আজই শুরু করুন। সুর ঠিক হোক বা না হোক, কণ্ঠ সুন্দর হোক বা না হোক—মন খুলে গাইুন। আপনার শরীর আর মন আপনাকে ধন্যবাদ দেবে।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

