Homeঅর্থ-বানিজ্যযশোরে তেলের হাহাকার! পেট্রোল নেই, অকটেনেও লম্বা লাইন – আসলে কী ঘটছে?

যশোরে তেলের হাহাকার! পেট্রোল নেই, অকটেনেও লম্বা লাইন – আসলে কী ঘটছে?

Share

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা ঘিরে জ্বালানি তেলের সংকট হতে পারে— এমন গুজব ছড়িয়ে পড়তেই যশোরে শুরু হয়েছে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। সাধারণ মানুষ ও মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে আতঙ্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে শুক্রবার (৬ মার্চ) সকাল থেকেই শহরের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে তেল সংগ্রহের জন্য মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যায়।

অনেকেই ভবিষ্যতে তেল পাওয়া যাবে কি না— এই আশঙ্কায় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুদ করতে শুরু করেন। এতে কয়েকটি পাম্পে দ্রুত পেট্রোল ও অকটেন ফুরিয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক পাম্প কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে তেল বিক্রি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।

যশোর শহরের বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকেই অস্বাভাবিক ভিড় লক্ষ্য করা যায়। সাধারণত যেখানে দিনে মাঝেমধ্যে কয়েকটি মোটরসাইকেল বা গাড়ি দেখা যায়, সেখানে এদিন শত শত যানবাহন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে।

অনেক মোটরসাইকেল চালক শুধু ট্যাংক ভরেই থেমে থাকেননি। কেউ কেউ ক্যান, বোতল কিংবা ড্রাম নিয়ে এসে তেল নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাদের অনেকের ধারণা— কয়েকদিনের মধ্যে যদি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সমস্যায় পড়তে হবে।

এই ভিড় সামাল দিতে গিয়ে পাম্পগুলোর কর্মীদেরও বেশ বেগ পেতে হয়। কোথাও কোথাও বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ায় পাম্প কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ করে দেয়।

শুক্রবার বিকেলের দিকে যশোর শহরের আরএন রোড এলাকায় তেলের জন্য সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায়। বিশেষ করে যাত্রিক পেট্রোলিয়াম সার্ভিসের সামনে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।

মোটরসাইকেল চালকদের পাশাপাশি অনেকেই ক্যান ও ড্রামে করে তেল নিতে এসেছিলেন। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

পাম্প কর্তৃপক্ষ জানান, সকাল থেকেই ক্রেতাদের চাপ ছিল অস্বাভাবিক। অনেকেই একবারে পুরো ট্যাংক ভরে তেল নিয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ বাড়তি তেল মজুদ করার চেষ্টা করছেন।

অতিরিক্ত ভিড় সামাল দিতে বেশ কয়েকটি পাম্পে সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কিছু স্টেশনে মোটরসাইকেলে ২০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না বলে জানা গেছে। এতে অনেকেই হতাশ হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাম্প কর্তৃপক্ষ এই ব্যবস্থা নেয়।

ঢাকা রোডের তালতলা এলাকার একটি ফুয়েল স্টেশনের ম্যানেজার এএসএম খালিদ বলেন, তাদের পাম্পে সবসময়ই কিছুটা ভিড় থাকে। তবে বুধবার রাত থেকে ক্রেতার সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়।

তার ভাষায়, “অনেক মোটরসাইকেল মালিক পুরো ট্যাংক ভরে তেল নিয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ভবিষ্যতের কথা ভেবে মজুদ করার চেষ্টা করছেন। এই কারণেই ভিড় এত বেড়ে গেছে।”

অস্বাভাবিক চাহিদার কারণে যশোর শহরের কয়েকটি পাম্পে দ্রুত তেল শেষ হয়ে যায়। ফলে অনেক স্টেশনের সামনে ‘দুঃখিত, তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেছে।

গাড়িখানা ফুয়েল স্টেশনের কর্মীরা জানান, সকালে পেট্রোল শেষ হয়ে যায়। এরপর সারাদিন শুধু অকটেন সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বিকেলের মধ্যেই সেটিও শেষ হয়ে যায়।

তারা বলেন, শুক্রবার ও শনিবার সাধারণত নতুন তেল সরবরাহ আসে না। তাই পরের দিনও তেল দেওয়া সম্ভব হবে না। একই পরিস্থিতি শহরের আরও কয়েকটি স্টেশনে দেখা গেছে।

শুধু শহরের কেন্দ্রেই নয়, আশপাশের এলাকাগুলোতেও একই অবস্থা তৈরি হয়েছে।

পুলেরহাট, চাঁচড়া ও মেডিক্যাল কলেজ এলাকার ফুয়েল স্টেশনগুলোতেও ক্রেতাদের বড় ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। অনেক জায়গায় পাম্প কর্তৃপক্ষ মোটরসাইকেলে সীমিত পরিমাণ তেল দিচ্ছেন।

ফলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেককে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে।

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম পেট্রোল পাম্পগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন স্টেশনে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

কোতোয়ালি থানার ওসি ফারুক আহমেদ জানান, পাম্পমালিকদের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে— যানবাহন ছাড়া অন্য কোনো পাত্রে তেল দেওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, “যদি কোনো কৃষকের কৃষিকাজের জন্য ডিজেল প্রয়োজন হয়, তাহলে তাকে থানার বা ফাঁড়ি থেকে স্লিপ নিয়ে আসতে হবে। সেই স্লিপ দেখিয়ে তেল সংগ্রহ করতে পারবেন।”

প্রশাসনের দাবি, বাস্তবে কোনো জ্বালানি তেলের সংকট নেই। গুজবের কারণেই মানুষ আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কিনছেন।

ওসি ফারুক আহমেদ বলেন, “মানুষ অকারণে সংকটের আশঙ্কা করছে। যদি সবাই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুদ করতে শুরু করে, তখনই প্রকৃত সমস্যা তৈরি হয়।”

তিনি আরও জানান, কেউ যদি অযথা তেল মজুদ করার চেষ্টা করেন বা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় প্রশাসন ও পাম্প সংশ্লিষ্টরা সবাইকে গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে গুজব অনেক সময় বড় সংকট তৈরি করে। যখন মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মজুদ করতে শুরু করে, তখন স্বাভাবিক বাজারেও ঘাটতি দেখা দেয়।

এ কারণেই প্রশাসন সবাইকে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী তেল ব্যবহার করা এবং অকারণে মজুদ না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

যশোরে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, একটি গুজব কত দ্রুত মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে পারে।

একদিকে পাম্পে ভিড়, অন্যদিকে সীমিত সরবরাহ— সব মিলিয়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ব্যাহত হয়েছে। তবে প্রশাসন ও পাম্প মালিকদের সমন্বিত উদ্যোগে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সাধারণ মানুষের সচেতন আচরণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সবাই যদি প্রয়োজন অনুযায়ী তেল ব্যবহার করেন এবং গুজবে কান না দেন, তাহলে জ্বালানি সরবরাহে কোনো সমস্যা তৈরি হওয়ার কথা নয়।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন