যশোরে এখন এক নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব চলছে। এই বিপ্লবের নায়ক কোনো বড় শিল্পপতি নন, কোনো করপোরেট গ্রুপও নয়। এই পরিবর্তনের কারিগর ঘরের ভেতর থাকা সাধারণ নারীরা। সংসার, সন্তান আর পারিবারিক দায়িত্ব সামলে নিজেদের অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে তাঁরা গড়ে তুলেছেন এক বিশাল উদ্যোক্তা নেটওয়ার্ক। যার নাম ‘আগামীর উদ্যোক্তা’। এই প্ল্যাটফর্ম শুধু আয় বাড়ায়নি, বদলে দিয়েছে নারীর আত্মবিশ্বাস, সামাজিক অবস্থান আর পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চিত্র।
যশোরে নারী উদ্যোক্তার উত্থান
একসময় যশোরের অনেক নারী নিজেদের সীমাবদ্ধ ভাবতেন চার দেয়ালের ভেতর। মনে হতো সংসারই শেষ পরিচয়। কিন্তু সময় বদলেছে। সুযোগ পেলে নারীরাও যে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার মূল শক্তি হতে পারেন, সেটাই এখন বাস্তব সত্য। ‘আগামীর উদ্যোক্তা’ সেই সত্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
শুরুর দিকে মাত্র কয়েকজন নারী একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, অবসর সময় নষ্ট না করে কিছু একটা করবেন। সেই ছোট সিদ্ধান্তই আজ হাজারের কাছাকাছি নারীকে দিয়েছে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ। তাঁরা এখন শুধু নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্যও অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছেন।
করোনাকালেই জন্ম নেয় আগামীর উদ্যোক্তা
করোনার সময় যখন পুরো দেশ ঘরবন্দী, তখন অনেকেই হতাশায় ডুবে গিয়েছিলেন। ঠিক সেই সময় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার শিহাব উদ্দিন ভাবলেন, ঘরে বসে কিছু করার ব্যবস্থা করা যায় কি না। তাঁর চিন্তা ছিল বাস্তব আর মানবিক। তিনি জানতেন, এই কাজে নারীদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় একটি অ্যাপ। শুরুতে মাত্র ৩০ জন নারী তাঁদের অবসর সময় দিয়ে ঘরে তৈরি খাবার বানাতে শুরু করেন। কেউ রান্না করতেন দুপুরের খাবার, কেউ বানাতেন পিঠা। এভাবেই যাত্রা শুরু হয় ‘আগামীর উদ্যোক্তা’ প্ল্যাটফর্মের।
অবসর সময় থেকে আয়ের গল্প
অনেক নারী প্রথমে ভাবতেই পারেননি যে অবসর সময় থেকেও আয় করা সম্ভব। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁরা বুঝতে পারেন, নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগালে আয় আসবেই। কেউ ঘরে তৈরি খাবার বানাচ্ছেন, কেউ পিঠাপুলি, কেউ আবার খাঁটি গুঁড়া মরিচ, হলুদ, চালের গুঁড়া, গুড় আর পাটালি তৈরি করছেন। কেউ কেউ কেক বানিয়ে নিজের আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছেন।
এই পণ্যগুলো শুধু যশোরেই নয়, আশপাশের এলাকাতেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ একটাই, খাঁটি আর ঘরের স্বাদ। গ্রাহকের বিশ্বাস তৈরি হতেই অর্ডার বাড়তে থাকে।
নারীর স্বাবলম্বিতা আর পারিবারিক সমর্থন
যখন নারীরা ঘরে বসে আয় করতে শুরু করলেন, তখন পরিবারও তাঁদের পাশে দাঁড়াল। আগে যাঁদের কাজকে শখ বলে মনে করা হতো, এখন সেটাই পরিবারের আয়ের বড় উৎস। এতে নারীদের আত্মবিশ্বাস যেমন বেড়েছে, তেমনি পরিবারের ভেতর তাঁদের সিদ্ধান্তের গুরুত্বও বেড়েছে।
অনেক স্বামী এখন স্ত্রীর কাজে সহযোগিতা করেন। কেউ পণ্য পৌঁছে দিতে সাহায্য করেন, কেউ কাঁচামাল আনেন। এতে পরিবারে তৈরি হয়েছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর বোঝাপড়া।
নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ
‘আগামীর উদ্যোক্তা’ শুধু নারীদের আয় বাড়ায়নি, সৃষ্টি করেছে নতুন কর্মসংস্থানও। নারীদের তৈরি পণ্য গ্রাহকের ঠিকানায় পৌঁছে দিতে কাজ পাচ্ছেন অনেক তরুণ। কেউ ডেলিভারির দায়িত্বে, কেউ প্যাকেজিংয়ে, কেউ আবার অর্ডার ম্যানেজমেন্টে।
এই প্ল্যাটফর্ম একা একা নয়, পুরো একটি ছোট অর্থনৈতিক চেইন তৈরি করেছে। যেখানে নারী উদ্যোক্তা, তরুণ কর্মী আর গ্রাহক সবাই লাভবান হচ্ছেন।
যশোরে ব্যাপক সাড়া
খুব অল্প সময়েই যশোরে এই নারী উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে এর সাফল্যের গল্প। এখন এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত নারীর সংখ্যা আট শতাধিক। প্রতি বছর নতুন নতুন নারী এতে যুক্ত হচ্ছেন।
এই বছর শুধু এই প্ল্যাটফর্ম থেকেই আয় হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা। আর শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মোট আয় ছয় কোটি টাকারও বেশি। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, এগুলো নারীর শক্তির প্রমাণ।
নারী উদ্যোক্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
যশোরের এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, নারী উদ্যোক্তা মানেই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজে। যখন নারী আয় করেন, তখন পরিবারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর পুষ্টির মান বাড়ে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করা সহজ হয়।
এভাবে এক একজন নারী উদ্যোক্তা আসলে একটি সুস্থ সমাজ গড়ার ভিত তৈরি করছেন। তাঁদের অবদান শুধু অর্থনীতিতে নয়, সামাজিক পরিবর্তনেও।
ভবিষ্যতের পথচলা
‘আগামীর উদ্যোক্তা’ এখন শুধু একটি প্ল্যাটফর্ম নয়, এটি একটি আন্দোলন। লক্ষ্য আরও বেশি নারীকে যুক্ত করা। প্রযুক্তির মাধ্যমে পণ্য বিপণন আরও সহজ করা। দেশের বাইরেও যশোরের নারীদের তৈরি পণ্য পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তারা।
এই উদ্যোগ যদি সঠিক সহায়তা পায়, তবে এটি জাতীয় পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নের একটি মডেল হতে পারে।
চিরন্তন সত্যের প্রতিফলন
নারীদের অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে বছরে আড়াই কোটি টাকা আয় শুধু একটি সফলতার গল্প নয়। এটি কবি নজরুলের সেই অমর পঙক্তির বাস্তব প্রতিফলন—
“বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
যশোরের নারীরা আজ সেটাই প্রমাণ করে চলেছেন। ঘরের ভেতর থেকেও যে সমাজ বদলানো যায়, অর্থনীতি গড়া যায়, তা তাঁরা দেখিয়ে দিয়েছেন কাজ দিয়ে, কথায় নয়।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

