মহান স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে যশোরের মণিহার চত্বরে স্থাপিত বিজয় স্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়। প্রতিবছরের মতো এবারও মহান স্বাধীনতা দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের কর্মসূচি ছিল। কিন্তু কর্মসূচির শুরুতেই বিজয় স্তম্ভে কাপড় জড়ানোর একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আর এ নিয়ে দিনভর আলোচনা সমালোচনা চলছে ফেসবুকজুড়ে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, যশোর শহরের মণিহার এলাকায় অবস্থিত মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়স্তম্ভটি ১৯৭২ সালের ২৬ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা হয়। বিজয়স্তম্ভের ওই স্মারকে লেখা আছে-‘মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মদানকারী বীর শহীদদের স্মরণে বিজয়স্তম্ভ/ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন/ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান/ ১৯৭২ সাল, ২৬ ডিসেম্বর।’
প্রতি বছর ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস ও ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে যশোরবাসী শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এই বিজয়স্তম্ভে। প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও যশোরবাসী শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। কিন্তু এবার শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের আগমুহূর্তে বিজয়স্তম্ভে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ফলক গাঢ় কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় সমালোচনার ঝড় ওঠে।
তবে জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ৫ আগস্টের পর বিজয় স্তম্ভ ও স্তম্ভের শিলান্যাস ক্ষতিগ্রস্ত ও বিকৃত করা হয়েছে। ফলে গত দু’বছর ধরেই বিজয়স্তম্ভটি সাদা কাপড়ে জড়িয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়েছে। এবছরও একই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু ভোরে কে বা কারা সাদা কাপড়টি খুলে নিয়ে গেছে।
ফলে শেষ মুহূর্তে শিলান্যাসের বিকৃতি, অসংলগ্ন লেখা ও আঁকা যাতে দৃষ্টিগোচর না হয় সেজন্য একটি কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। আর কাপড়টি কালো নয়! বিজয় স্তম্ভের মর্যাদা রক্ষায় তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যখ্যা করা হচ্ছে।
আর মুুক্তিযোদ্ধা ও কয়েকজন সামাজিক ব্যক্তিত্ব বলছেন, ইতিহাস বিকৃতির অংশ হিসেবেই শেখ মুজিবুর রহমানের নামফলক ঢেকে দেওয়া ও নোংরা পরিবেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে যশোরে স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচির সূচনা হয়। দিনের প্রথম ভাগে বিজয়স্তম্ভে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানের পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্যে দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন শুরু হয়। তারপর একে একে প্রশাসন, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা শ্রদ্ধা জানান।
বিজয়স্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় দেখা যায়, স্তম্ভের নিচের অংশটুকু একটি গাঢ় সবুজ রঙের কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা। তার উপরে ‘মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মদানকারী বীর শহীদদের স্মরণে’, এই লেখাটুকু দৃশ্যমান রয়েছে। বিজয়স্তম্ভের বেদীতে লাল কার্পেট দেওয়া হয়। পাশে শামিয়ানা টানানো একটি জায়গা থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বের ধারাবিবরণী দেওয়া হচ্ছিল।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন দোদুল বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকেই শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় বিজয়স্তম্ভে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ফলক কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখছে। এটা ইতিহাস বিকৃতির অংশ হিসেবেই করা হচ্ছে। ইতিহাসে যার যতটুকু সম্মান প্রাপ্য, তাকে ততটুকু দিতে হবে।’
জানতে চাইলে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হারুন অর রশিদ বলেন, গত বছরও কাপড় দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ফলক ঢেকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বিজয়স্তম্ভ চত্বর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ছিল। কিন্তু এবার বিজয়স্তম্ভ পরিস্কারও করেনি। প্রশাসনের ভিতরে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির লোকজন বেশি বলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তারা এই কাজটি অন্যায় করেছে। তারা স্বাধীনতার প্রতি অন্যায় করেছেন। তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।’
এ বিষয়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সদস্য সচিব আব্দুল মালেক সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি চোখ বন্ধ করে গেছি, চোখ বন্ধ করে এসেছি। তারা (প্রশাসন) এ চেতনার লোক নন। ইতিহাস কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। এটা নোংরামি।’
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকে এভাবেই শ্রদ্ধা নিবেদন করা হচ্ছে। এবারই প্রথম নয়। বিজয়স্তম্ভ ব্যবস্থাপনার একটি উপ-কমিটি আছে।
তারা সৌন্দর্য্যবর্ধনের কাজটি করেন। মূলত সৌন্দর্য্যবর্ধনের জন্যই বিজয়স্তম্ভে অন্য বছর সাদা কাপড় ব্যবহার করা হয়। এবছর গাঢ় সবজু কাপড় ব্যবহার করেছে। বিজয়স্তম্ভ সংস্কার না হওয়ায় এমনটি করা হয়েছে। বিজয়স্তম্ভ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

