২০২৫ সালে যশোর জেলা নিঃসন্দেহে এক ভয়ঙ্কর বছরে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধ, পারিবারিক বিবাদ এবং স্বজনের হাতে স্বজন খুনের মতো ঘটনাগুলো এই জেলার শান্তিপ্রিয় সমাজকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এক বছরের মধ্যে যশোরে মোট ৬০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব হত্যার অধিকাংশে সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে এবং অনেককেই গ্রেফতার করা হয়েছে।
তরিকুল ইসলামের হত্যাকাণ্ড: মাছের ঘের বিরোধে রক্তক্ষয়
২২ মে অভয়নগর উপজেলার সুন্দলী ইউনিয়নের ডহর মশিয়াহাটী গ্রামে ঘটে এক নির্মম হত্যাকাণ্ড। নওয়াপাড়া পৌর কৃষকদলের সভাপতি তরিকুল ইসলাম দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন। পুলিশের তথ্যমতে, তরিকুলের মাছের ঘের নিয়ে একটি গ্রুপের সঙ্গে বিরোধ ছিল। ওই গ্রুপের লোকজন তরিকুলকে ডেকে নিয়ে গিয়ে, ঘেরের টাকার হিসাবকে কেন্দ্র করে তার উপর হামলা চালায়। সেখানে উপস্থিত ৬-৭ জন তরিকুলকে গুলি ও কোপ দিয়ে হত্যা করে। পরে তারা স্থানীয় বাজারের কয়েকটি দোকানেও অগ্নিসংযোগ করে পালিয়ে যায়।
এই হত্যার পর মাতুয়া সম্প্রদায়ের প্রায় ২০টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ঘটে, যা দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তদন্তে দেখা যায়, যদিও হত্যার মূল কারণ মাছের ঘের বিরোধ, তবুও চরমপন্থী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার প্রমাণও পাওয়া গেছে।
জুন মাসের রক্তক্ষয়: জমি ও পারিবারিক বিবাদের রেশ
৯ জুন যশোর সদর উপজেলার ডাকাতিয়া গ্রামে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে মইন উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই রাতেই চৌগাছার পুড়াহুদা গ্রামে ছোট ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে বড় ভাই রবিউল ইসলাম নিহত হন।
১৪ জুন অভয়নগরের নাউলি গ্রামে কুয়েত প্রবাসী হাসান শেখকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। নিহতের ভাই মুন্না জানান, পূর্বশত্রুতার জেরেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। একই রাতে শার্শার দুর্গাপুর বাজারে রাজনৈতিক বিরোধের জেরেও নিহত হন বিএনপি কর্মী লিটন হোসেন।
ঈদের দিন চাঞ্চল্যকর ঘটনা ও শিশু নির্যাতন
ঘটনার মাত্র চারদিন আগে, শার্শার ডুবপাড়া গ্রামে ককটেল বিস্ফোরণে নিহত হন বিএনপি নেতা আব্দুল হাই। সেই একই দিনে ঝিকরগাছার হাড়িয়া গ্রামে বেড়াতে এসে নিখোঁজ হয় ১০ বছরের শিশু সোহানা। পরে তার ধর্ষিত মরদেহ পুকুরে পাওয়া যায়। পুলিশ ওই ঘটনায় নয়ন ওরফে নাজমুস সাকিবকে গ্রেফতার করে।
মাসভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান
যশোর পুলিশ সুপার কার্যালয় জানায়, ২০২৫ সালে মোট ৬০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। মাসভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী: জানুয়ারি: ৪টি, ফেব্রুয়ারি: ৩টি, মার্চ: ৬টি, এপ্রিল: ৬টি, মে: ৭টি, জুন: ৮টি, জুলাই: ৬টি, আগস্ট: ৬টি, সেপ্টেম্বর: ২টি, অক্টোবর: ৭টি, নভেম্বর: ৩টি, ডিসেম্বর: ২টি। এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, জুন মাসে সর্বাধিক ৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
পুলিশের প্রতিক্রিয়া ও তৎপরতা
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) আবুল বাশার জানিয়েছেন, “২০২৫ সালে যশোরে ৬০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অধিকাংশ ঘটনার মোটিভ চিহ্নিত করা হয়েছে এবং জড়িতদের অনেককেই গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা জেলাটিতে শান্তি বজায় রাখতে সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।”
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সবসময় সতর্ক রয়েছে এবং যেকোনো সংঘাত বা শত্রুতাকে প্রাথমিক পর্যায়েই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।
সামাজিক ও ন্যায়িক প্রভাব
এই হত্যাকাণ্ডগুলো শুধু পরিবার বা প্রয়োজনীয় ব্যক্তির ক্ষতি করছে না, বরং পুরো যশোর জেলাকে আতঙ্কিত করেছে। স্থানীয় মানুষদের মনে নিরাপত্তাহীনতার ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সামাজিক বন্ধনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চরমপন্থী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা, রাজনৈতিক প্রতিশোধ এবং পারিবারিক বিবাদ দূরীকরণে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য।
যশোরের ঘটনা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে এমন পরিস্থিতিতে আরও সক্রিয় ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
২০২৫ সাল যশোরের ইতিহাসে মর্মান্তিকভাবে রক্তের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে পুলিশ ও প্রশাসনের কার্যক্রম যদি তৎপর থাকে, ভবিষ্যতে এমন হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কমানো সম্ভব। নিরাপত্তা, সচেতনতা এবং সামাজিক সংহতি মিলিয়ে যশোরকে আবারও শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জেলা হিসেবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

