Homeঅর্থ-বানিজ্যজ্বালানি সংকটের ঝড়: কেন তেলের দামের ওঠানামা পুরো পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেয়

জ্বালানি সংকটের ঝড়: কেন তেলের দামের ওঠানামা পুরো পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেয়

Share

বিশ্ব রাজনীতি আর জ্বালানি বাজার—এই দুইটা বিষয় আসলে একে অপরের সঙ্গে খুব গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কোথাও যুদ্ধ শুরু হলে তার ঢেউ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো পৃথিবীতে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে তেলের বাজারে। আর তেলের দাম বাড়া বা কমা মানে শুধু জ্বালানির বিল বাড়া নয়, বরং পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ বদলে যাওয়া।

সম্প্রতি ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্থির হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের কারণে তেল উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাধা তৈরি হয়েছে। ফলে সরবরাহ কমে যাওয়ায় তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। এক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে যায়। যদিও পরে দাম কিছুটা কমেছে, তবুও যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় তা এখনও অনেক বেশি।

এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। অনেক দেশেই জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।

জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট

এই সংঘাত আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে বিশ্ব এখনও শক্তির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর কতটা নির্ভরশীল। অনেকেই বলছেন, এই পরিস্থিতি অনেকটা ১৯৫০ ও ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। তবে এবার প্রভাব আরও বড় হতে পারে।

বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। ফলে তেল পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে থাকা তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো দ্রুত উৎপাদন বাড়িয়ে এই ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল বা নরওয়ের মতো দেশগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতা সীমিত। কিছু পাইপলাইন বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহার করা গেলেও তা মোট চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।

এই কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরাকে তেল উৎপাদন ৬০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। একই সঙ্গে কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে।

প্রাকৃতিক গ্যাসেও দেখা দিয়েছে সংকট

সংকট শুধু তেলেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও একই অবস্থা তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ কাতার সামরিক হামলার কারণে তাদের কিছু উৎপাদন স্থগিত করেছে। ফলে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে।

এই ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইউরোপ ও এশিয়ায় গ্যাসের সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো এই সংকটে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ তাদের অধিকাংশই জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তাই অনেক সরকার ইতিমধ্যেই দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ বা রেশনিংয়ের মতো ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে।

তেলের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব

যখন তেলের দাম বাড়ে, তখন তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার ওপর।

যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট—এই দুই ধরনের তেলের দামই দ্রুত বেড়ে যায়। এক সময় প্রতি ব্যারেল প্রায় ১২০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়। যদিও পরে দাম কিছুটা কমে ৮৫ ডলারের নিচে নেমে আসে, তবুও বাজারে অস্থিরতা রয়ে গেছে।

ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। সেখানে এক মাস আগেও প্রতি গ্যালন জ্বালানির দাম ছিল প্রায় ২.৯০ ডলার, যা এখন বেড়ে প্রায় সাড়ে তিন ডলারে পৌঁছেছে।

বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে থাকে, তাহলে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে।

অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য বড় ধাক্কা

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এমনকি তেলের দাম ১৫০ ডলার প্রতি ব্যারেল পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে অর্থনীতির ওপর চাপ ভয়াবহ হয়ে উঠবে। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সবকিছুর দাম বাড়ে।

পরিবারগুলো তখন দৈনন্দিন খরচ কমাতে বাধ্য হয়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও নতুন বিনিয়োগে সতর্ক হয়ে যায়। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতি ধীর হয়ে পড়ে।

প্রযুক্তি খাতেও পড়তে পারে প্রভাব

জ্বালানি সংকট প্রযুক্তি খাতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ আধুনিক প্রযুক্তি উৎপাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়।

বিশেষ করে চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন অত্যন্ত শক্তিনির্ভর শিল্প। গাড়ি, স্মার্টফোন, কম্পিউটার—সবকিছুতেই এই চিপ লাগে। বিশ্বের অন্যতম বড় চিপ উৎপাদন কেন্দ্র তাইওয়ান, যা জ্বালানি আমদানির ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল।

যদি জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে চিপ উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে প্রযুক্তি খাতে নতুন করে সংকট দেখা দিতে পারে।

একইভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো তৈরি করতেও বিপুল বিদ্যুৎ ও শক্তির প্রয়োজন হয়। তাই জ্বালানির দাম বাড়লে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যয়ও বাড়বে।

কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনেও চাপ

জ্বালানি সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে কৃষিতে। কারণ কৃষিতে ব্যবহৃত অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অ্যালুমিনিয়াম ও সালফারের মতো উপাদান ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহার হয়। আবার সারের প্রধান উপাদান ইউরিয়াও মধ্যপ্রাচ্যের বড় রপ্তানি পণ্য।

এই পণ্যের দাম বাড়লে কৃষকদের খরচও বেড়ে যায়। অনেক সময় তারা প্রয়োজনীয় সার সময়মতো পায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের এক কৃষক জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে তার সার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রেখেছে। পরে তারা দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এতে প্রতি একর জমিতে তার সারের খরচ প্রায় ১০০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।

এমন পরিস্থিতি কৃষকদের লাভ কমিয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যের দামও বাড়িয়ে দেয়।

শেয়ারবাজার ও রাজনীতিতে প্রভাব

জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু অর্থনীতিতেই নয়, রাজনীতিতেও দেখা যায়।

এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশের শেয়ারবাজার ইতিমধ্যেই চাপের মুখে পড়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ার সূচক যথাক্রমে প্রায় ১০ ও ১৫ শতাংশ কমেছে। জার্মানির বাজারেও উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।

কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বাড়ে। সামনে নির্বাচন থাকলে এই ধরনের পরিস্থিতি সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হলে এই অস্থিরতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এমনকি কোনো পক্ষ যুদ্ধ শেষ ঘোষণা করলেও বাস্তবে উত্তেজনা চলতে পারে।

এই কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজার এখন খুবই অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। তেলের দাম কখন বাড়বে বা কমবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর।

এক কথায় বলা যায়, তেলের বাজারের এই অস্থিরতা শুধু জ্বালানির দাম নয়—বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। আর সেই কারণেই বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওঠানামা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন