Homeঅর্থ-বানিজ্যবিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে নতুন ইতিহাস : আউন্সপ্রতি ৫৬০০ ডলার, কেন এত বাড়ছে...

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে নতুন ইতিহাস : আউন্সপ্রতি ৫৬০০ ডলার, কেন এত বাড়ছে সোনা?

সোনা আবারও বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সামনে কী হবে, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত স্বর্ণ যে তার উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে না, সেটাই সবচেয়ে বড় সত্য।

Share

বিশ্ব অর্থনীতি যখন অনিশ্চয়তার দোলাচলে, তখন স্বর্ণ আবারও প্রমাণ করল কেন একে নিরাপদ বিনিয়োগের রাজা বলা হয়। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক ঋণ সংকট, ডলারের দুর্বলতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতিগত অনিশ্চয়তার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম গড়ে তুলেছে নতুন ইতিহাস। আউন্সপ্রতি স্বর্ণের দাম এক পর্যায়ে প্রায় ৫ হাজার ৬০০ ডলারে পৌঁছে সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এই উত্থান শুধু একটি সংখ্যার গল্প নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ভেতরের গভীর সংকেত বহন করছে।

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম একদিনেই ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। দিনের এক পর্যায়ে আউন্সপ্রতি দাম উঠে যায় ৫ হাজার ৫৯১ ডলারেরও ওপরে, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। দিনের শেষ দিকে সামান্য সংশোধনের পরও দাম দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ৫১২ ডলারে। চলতি সপ্তাহের শুরুতেই প্রথমবারের মতো সোনার দাম ৫ হাজার ডলার অতিক্রম করেছিল, আর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেটি আরও কয়েকশ ডলার বেড়ে নতুন রেকর্ড গড়ল।

এই দ্রুত ঊর্ধ্বগতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ এত অল্প সময়ে এমন লাফ সাধারণত খুব কমই দেখা যায়।

স্বর্ণের দামের এই রেকর্ড উত্থানের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। প্রথমত, বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে দূরে সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঋণের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। অনেক দেশ উচ্চ সুদের বোঝা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কাগুজে মুদ্রার ওপর আস্থা কিছুটা কমে আসছে, আর সোনার মতো বাস্তব সম্পদের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে।

তৃতীয়ত, মার্কিন ডলারের দুর্বলতা স্বর্ণের দাম বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। ডলার দুর্বল হলে সাধারণত সোনার দাম বাড়ে, কারণ অন্যান্য মুদ্রাধারীদের কাছে স্বর্ণ তখন তুলনামূলক সস্তা হয়ে যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বর্ণ কেনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বর্ণের অংশ বাড়াচ্ছে। এই শক্তিশালী চাহিদা বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, ফলে দাম আরও বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এখন সোনা শুধু মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা নয়। এটি ধীরে ধীরে একটি নিরপেক্ষ এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সংরক্ষণের মাধ্যম হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক বা মুদ্রানীতির পরিবর্তন হলেও স্বর্ণ তার গুরুত্ব হারাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সাম্প্রতিক বৈঠকে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল স্পষ্ট করে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি এখনো তাদের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে রয়েছে। এই বক্তব্য বাজারে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, সুদ কমানোর বিষয়ে ফেড এখনই খুব আগ্রহী নয়।
উচ্চ সুদের দীর্ঘস্থায়িত্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করতে পারে—এই আশঙ্কাও বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে সোনার প্রতি চাহিদা আরও বেড়েছে।

চলতি বছরে এখন পর্যন্ত স্বর্ণের দাম ২৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে দাম বেড়েছিল প্রায় ৬৪ শতাংশ, যা ছিল নজিরবিহীন। টানা দুই বছরে এমন উত্থান স্বর্ণকে আবারও বিনিয়োগের মূল আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদে দামে কিছুটা সংশোধন আসতে পারে। কারণ এত দ্রুত দাম বাড়লে অনেক বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে নিতে চাইতে পারেন। তবে মৌলিক দিক থেকে সোনার অবস্থান এখনো শক্ত। তাই বড় ধরনের দরপতন হলেও সেটিকে অনেকেই নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখবেন।

স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার বাজারেও দেখা গেছে শক্তিশালী উত্থান। স্পট মার্কেটে রুপার দাম আউন্সপ্রতি বেড়ে প্রায় ১১৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। দিনের শুরুতে এটি ১১৯ ডলারের ওপরে উঠে নতুন রেকর্ড গড়েছিল। চলতি বছরে রুপার দাম ইতোমধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা শিল্প ও বিনিয়োগ—দুই দিক থেকেই চাহিদা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
প্লাটিনামের দামও সামান্য বেড়ে আউন্সপ্রতি প্রায় ২ হাজার ৭১০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। যদিও এর আগে এটি আরও বেশি দামে লেনদেন হয়েছে। অন্যদিকে প্যালাডিয়ামের দাম কিছুটা কমে প্রায় ২ হাজার ৪৮ ডলারে নেমেছে। শিল্প খাতে চাহিদার ওঠানামার কারণেই মূলত এই ধাতুগুলোর দামে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যত বাড়বে, নিরাপদ বিনিয়োগের গুরুত্ব ততই বাড়বে। স্বর্ণ তার সেই ঐতিহাসিক ভূমিকা আবারও দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করছে।

যারা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের কথা ভাবছেন, তাদের জন্য সোনা এখনো একটি শক্তিশালী বিকল্প। তবে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি, কারণ বাজারে হঠাৎ ওঠানামা হতে পারে। অভিজ্ঞ বিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পনা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই বাজারে ঢোকা ঠিক নয়।

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের রেকর্ড দাম শুধু একটি অর্থনৈতিক খবর নয়, এটি বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রতিফলন। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং মুদ্রানীতির জটিলতার মাঝে সোনা আবারও বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সামনে কী হবে, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত স্বর্ণ যে তার উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে না, সেটাই সবচেয়ে বড় সত্য।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন