ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে দীর্ঘদিনের আলোচনার পর অবশেষে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের দোরগোড়ায়। ২০০৭ সাল থেকে চলা এই আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, এই চুক্তি ভারতের বাজার, শিল্প ও বৈদেশিক কূটনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ইউরোপীয় নেতারা একে ‘মাদার অফ অল ডিলস’ বলেই আখ্যা দিয়েছেন, যা থেকেই বোঝা যায় এর গুরুত্ব কতটা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে বর্তমানে ২৭টি দেশ রয়েছে। এই বিশাল জোটের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন নয়, কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অভাবে বহু সম্ভাবনা এতদিন অধরাই ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি অস্থির হওয়ায় ভারত বিকল্প বাজার খুঁজছে। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি না হওয়া এবং উচ্চ শুল্কের ধাক্কা ভারতের রপ্তানিকে চাপের মুখে ফেলেছে। সেই প্রেক্ষাপটেই ইউরোপের সঙ্গে এই সমঝোতা ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিক হল বিদেশি গাড়ির দাম কমার সম্ভাবনা। বর্তমানে ইউরোপ থেকে আমদানি হওয়া গাড়ির উপর প্রায় ১১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। প্রস্তাবিত চুক্তি কার্যকর হলে, ১৫ হাজার ইউরোর বেশি দামের গাড়ির উপর শুল্ক কমে প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি নেমে আসতে পারে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের বাজারে। বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ বেঞ্জের মতো প্রিমিয়াম ইউরোপীয় ব্র্যান্ডের গাড়ি তখন তুলনামূলকভাবে সস্তা হবে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি কেনা তখন আর আগের মতো কঠিন থাকবে না।
শুধু গাড়ি নয়, এই বাণিজ্য চুক্তির ফলে বিদেশি ওয়াইনও সস্তা হতে পারে। বর্তমানে ইউরোপীয় ওয়াইনের উপর ভারতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, এই শুল্ক কমানো হলে ইউরোপ থেকে আসা ওয়াইনের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
এর ফলে ভারতের ওয়াইন বাজারে বৈচিত্র্য বাড়বে। রেস্তোরাঁ, হোটেল ও খুচরো বাজারে ইউরোপীয় ওয়াইনের উপস্থিতি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা যাচ্ছে, কৃষিক্ষেত্র সংক্রান্ত বিষয়গুলি এই চুক্তিতে রাখা হচ্ছে না। তবে উৎপাদন শিল্প, আধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিসম্পদ এবং ওষুধ শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিকে চুক্তির আওতায় আনা হতে পারে।
বিশেষ করে ফার্মাসিউটিক্যালস ও নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে ভারত ও ইউরোপ একে অপরের পরিপূরক। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রযুক্তি আদান-প্রদান সহজ হবে এবং যৌথ বিনিয়োগের পথ খুলবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেয়েনের মতে, এই চুক্তি কার্যকর হলে প্রায় ২ বিলিয়ন মানুষের একটি বিশাল বাজার তৈরি হবে। এটি বিশ্বব্যাপী মোট জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করবে।
এই বাজার ভারতের রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই চুক্তির পথে সবকিছু সহজ নয়। ইউরোপের নতুন ‘কার্বন বর্ডার ট্যাক্স’ নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন। এই কর কার্যকর হলে ভারতের ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম রপ্তানির খরচ ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
ফলে ভারত এই ক্ষেত্রে ছাড় আদায়ের জন্য আলোচনা চালাচ্ছে। কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে ইউরোপ কঠোর অবস্থান নিলেও, উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই চুক্তি সম্পন্ন হলে ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে। ইউরোপীয় বড় সংস্থাগুলির সঙ্গে পাল্লা দেওয়া অনেক ছোট শিল্পের পক্ষে কঠিন হতে পারে।
তবে সরকারের ধারণা, সঠিক নীতিগত সহায়তা ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, এই চুক্তিকে ভারতের জন্য একটি কৌশলগত বিমা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এটি আমেরিকা ও চিনের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি, ভারতের সাপ্লাই চেইন আরও শক্তিশালী হবে।
প্রতিরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ইউরোপের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন দরজা খুলবে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মহল।
সব মিলিয়ে, ইউরোপ-ভারত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি শুধু সস্তা গাড়ি বা ওয়াইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি ভারতের অর্থনীতি, শিল্প এবং বৈদেশিক নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
যদি সব পক্ষের স্বার্থ সঠিকভাবে রক্ষা করা যায়, তবে এই চুক্তি ভারতের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, চূড়ান্ত শর্তে কতটা ভারসাম্য রাখা যায় এবং বাস্তবায়ন কতটা মসৃণ হয়।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

