নতুন বছরের শুরু কিংবা মকরসংক্রান্তি এলেই পুণ্যস্নানের ছবি চোখে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে নদী বা সাগরে নেমে বিশ্বাস আর আচার-অনুশীলনের অংশ হিসেবে স্নান করেন। কিন্তু সম্প্রতি এমন এক দৃশ্য সামনে এসেছে, যা দেখতে পুণ্যস্নানের মতো হলেও এর উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ধর্মীয় আচার নয়, বরং বিশ্বরেকর্ড গড়ার লক্ষ্যে বরফঠান্ডা জলে একসঙ্গে ডুব দিলেন প্রায় ৫ হাজার মানুষ।
এই ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের বার্চ বে-তে। নতুন বছরের শুরুতেই ভয়ংকর ঠান্ডা জল উপেক্ষা করে নারী-পুরুষ মিলিয়ে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন এক অভিনব চ্যালেঞ্জে, যা পরিচিত ‘পোলার বেয়ার ডিপ’ নামে।
পুণ্যস্নানের মতো দৃশ্য, কিন্তু উদ্দেশ্য একেবারেই আলাদা
প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এটি হয়তো কোনও ধর্মীয় উৎসব বা পুণ্যস্নান। কারণ একসঙ্গে এত মানুষ জলেতে নামছেন—এ দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় কেবল বিশেষ তিথি বা উৎসবেই। তবে বাস্তবে এর সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। এই স্নানের পেছনে ছিল একটাই লক্ষ্য—একটি আন্তর্জাতিক রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস তৈরি করা।
আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বরফশীতল জলে নির্দিষ্ট সময় ধরে অবস্থান করে অংশগ্রহণকারীরা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, মানুষের সহনশীলতা আর সাহসের কোনও সীমা নেই।
কঠোর শর্তেই বরফ জলে নামতে হয়েছিল অংশগ্রহণকারীদের
এই অভিনব স্নানে অংশ নিতে হলে সবাইকে মানতে হয়েছে বেশ কিছু কঠিন শর্ত। শুধু জলে নামলেই চলবে না—নিয়ম ভাঙলে রেকর্ডের অংশ হওয়া যাবে না।
প্রথম শর্ত ছিল, সবাইকে অন্তত এক মিনিট বরফঠান্ডা জলে থাকতে হবে। এই সময়ের আগে কেউ জল থেকে উঠতে পারবেন না। দ্বিতীয় শর্ত, শরীরে কোনও বিশেষ সুরক্ষামূলক পোশাক পরা যাবে না। সাধারণত ঠান্ডা জল থেকে শরীর রক্ষা করতে যে পোশাক ব্যবহার করা হয়, তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।
পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রায় খালি গায়ে এবং নারীদের ক্ষেত্রে সাধারণ সাঁতারের পোশাকে জলে নামতে হয়েছে। কেউ কেউ আবার বিকিনি পরেও অংশ নিয়েছেন। অর্থাৎ শরীরকে ঠান্ডা থেকে বাঁচানোর কোনও বাড়তি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল না।
সাইরেনের শব্দেই শুরু ও শেষ পুরো চ্যালেঞ্জ
এই ‘পোলার বেয়ার ডিপ’-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম ছিল সময়ের কড়া নিয়ন্ত্রণ। একটি সাইরেন বাজার সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে একসঙ্গে জলে নামতে হয়েছে। দেরি করার কোনও সুযোগ ছিল না। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে কোমর পর্যন্ত জলে ঢুকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে সবাইকে।
এরপর শুরু হয় সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা—বরফশীতল জলে এক মিনিট কাটানো। সেই সময় শরীর অবশ হয়ে আসা, শ্বাসকষ্ট, কাঁপুনি—সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে অংশগ্রহণকারীদের। এক মিনিট পূর্ণ হওয়ার আগে কেউ জল থেকে উঠতে পারেননি।
ঠিক এক মিনিট পর আবার সাইরেন বাজে, আর সঙ্গে সঙ্গেই সবাইকে জল থেকে উঠে আসতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটাই ছিল রেকর্ডের মূল শর্ত।
বার্চ বে-তে নজিরবিহীন মানুষের সমাগম
এই ব্যতিক্রমী আয়োজন ঘিরে ওয়াশিংটনের বার্চ বে-তে তৈরি হয় এক অভূতপূর্ব পরিবেশ। স্থানীয় প্রশাসন ও আয়োজকদের ধারণা, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৫ হাজারেরও বেশি হতে পারে। যদিও চূড়ান্ত সংখ্যা যাচাই-বাছাই শেষে নিশ্চিত করা হবে।
বরফঠান্ডা হাওয়ার মধ্যে, সমুদ্রের ঠান্ডা জল উপেক্ষা করে এত মানুষের একসঙ্গে জলে নামা—এই দৃশ্য দেখতে ভিড় জমিয়েছিলেন অসংখ্য দর্শকও।
‘পোলার বেয়ার ডিপ’ কী এবং কেন এত জনপ্রিয়
বরফঠান্ডা জলে সাহসিকতার সঙ্গে ডুব দেওয়ার এই আয়োজন ‘পোলার বেয়ার ডিপ’ নামে পরিচিত। পশ্চিমা দেশগুলোতে এটি একটি জনপ্রিয় চ্যালেঞ্জ ও উৎসবের মতো। অনেক জায়গায় নতুন বছরের শুরুতে বা বিশেষ দিনে এই ধরনের স্নানের আয়োজন করা হয়।
কেউ এটি করেন দাতব্য উদ্দেশ্যে, কেউ আবার করেন নিজের শারীরিক ও মানসিক শক্তি যাচাই করতে। তবে বার্চ বে-র এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল একটাই—বিশ্বরেকর্ড।
নরওয়ের রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস
এর আগে নরওয়েতে একসঙ্গে তিন হাজারের কিছু বেশি মানুষ ‘পোলার বেয়ার ডিপ’-এ অংশ নিয়ে রেকর্ড গড়েছিলেন। এতদিন সেটিই ছিল সর্বোচ্চ অংশগ্রহণকারীর রেকর্ড।
ওয়াশিংটনের বার্চ বে-তে ৫ হাজারের বেশি মানুষের একসঙ্গে বরফ জলে নেমে এক মিনিট অবস্থান করার মধ্য দিয়ে সেই রেকর্ড ভেঙে গেল। ফলে নতুন রেকর্ডের মালিক এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন।
২০২৬ সালের শুরুতেই স্মরণীয় ঘটনা
২০২৬ সালের শুরুতেই এই ঘটনাকে অনেকেই বছরের অন্যতম সাহসী ও ব্যতিক্রমী আয়োজন হিসেবে দেখছেন। বরফশীতল জলে এক মিনিট কাটানো সহজ কাজ নয়। তবু হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন, যা মানবসাহস ও ঐক্যের এক অনন্য উদাহরণ।
অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই জানিয়েছেন, এটি ছিল জীবনের অন্যতম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। ভয়, উত্তেজনা আর আনন্দ—সব অনুভূতি মিলেমিশে এক অন্যরকম স্মৃতি তৈরি করেছে।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
