কয়েকদিন ধরেই সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল—সব জায়গাতেই আলোচনার কেন্দ্রে একটি গান। কন্নড় সিনেমা ‘কেডি: দ্য ডেভিল’-এর একটি আইটেম গান ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী নোরা ফতেহি। অশ্লীল লিরিকস, দ্ব্যর্থবোধক শব্দ এবং চটুল নাচের অভিযোগে শেষ পর্যন্ত গানটি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় সরকার। এমনকি বিষয়টি পৌঁছে যায় সংসদ পর্যন্ত।
এই ঘটনাকে ঘিরে একদিকে যেমন সমালোচনার ঝড় উঠেছে, অন্যদিকে নোরা ফতেহির বক্তব্যও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চলুন পুরো বিষয়টা সহজভাবে বুঝে নেওয়া যাক।
ঘটনার শুরু মূলত একটি আইটেম গানকে ঘিরে। গানটির নাম ‘সারকে চুনার তেরি সারকে’। প্রথমে এটি কন্নড় ভাষায় তৈরি হলেও পরে হিন্দি সংস্করণ প্রকাশ পায়। আর সেই হিন্দি সংস্করণেই সমস্যা তৈরি হয়।
অনেকেই অভিযোগ করেন, গানের লিরিকসে এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যেগুলো দ্ব্যর্থবোধক এবং অশালীন ইঙ্গিত বহন করে। উদাহরণ হিসেবে কিছু লাইনের কথা তুলে ধরে বলা হয়, এগুলো সাধারণ দর্শকের জন্য অস্বস্তিকর এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
একটু ভেবে দেখো—ধরো তুমি পরিবারের সঙ্গে বসে একটা গান শুনছো, আর হঠাৎ এমন কিছু লাইন আসে যেগুলো শুনে সবাই অস্বস্তিতে পড়ে যায়। ঠিক এমনটাই অনুভব করেছেন অনেক দর্শক।
বিতর্ক এতটাই বাড়ে যে বিষয়টি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নজরে আসে। তারা এই গান নিয়ে আপত্তি তোলে এবং প্রশ্ন তোলে—এ ধরনের কনটেন্ট কি আদৌ জনসমক্ষে প্রচারযোগ্য?
কমিশনের মতে, এমন গান সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের উপর। ফলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার দাবি ওঠে।
বুধবার এই বিষয়টি সরাসরি পৌঁছে যায় লোকসভায়। সমাজবাদী পার্টির এক সদস্য প্রথম এই প্রসঙ্গ তোলেন। এরপর কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব সংসদে স্পষ্টভাবে জানান, গানটি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাকস্বাধীনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তারও সীমা আছে। সমাজ ও সংস্কৃতির স্বার্থে কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। শিল্পীদের স্বাধীনতা মানে এই নয় যে তারা যা খুশি প্রকাশ করতে পারবেন।
এই বক্তব্যের পরই গানটির উপর আনুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।
বিতর্কের মাঝে চুপ থাকেননি নোরা ফতেহি। তিনি একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন।
তার কথায়, তিনি এই গানের শুটিং করেছিলেন প্রায় তিন বছর আগে, এবং সেটিও কন্নড় ভাষায়। যেহেতু তিনি কন্নড় ভাষা বোঝেন না, তাই পুরো বিষয়টি তিনি টিমের উপর নির্ভর করেই করেছিলেন।
তিনি জানান, তখন তাকে যে অনুবাদ শোনানো হয়েছিল, সেখানে কোনও অশ্লীলতা ছিল না। তাই তিনি সেটাকে একটি সাধারণ নাচের পারফরম্যান্স হিসেবেই দেখেছিলেন।
কিন্তু পরে যখন হিন্দি সংস্করণ প্রকাশ পায়, তখনই সমস্যাটা তৈরি হয়। সেই সংস্করণে এমন কিছু শব্দ যোগ করা হয়, যেগুলো তার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল।
নোরা আরও জানান, গানটি মুক্তির পর তিনি নিজেই পরিচালককে বলেছিলেন যে এই গান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। এমনকি তিনি এই প্রজেক্ট থেকে নিজেকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে নেন।
একটা মজার ব্যাপার হলো—তিনি এই গানের কোনও প্রচারও করেননি। সাধারণত নিজের কাজ নিয়ে শিল্পীরা প্রচার করেন, কিন্তু এই ক্ষেত্রে তিনি তা এড়িয়ে গিয়েছিলেন। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বিষয়টি তার ইমেজের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো, গানটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর নোরা খুশিই হয়েছেন। তিনি বলেন, এই বিতর্ক না হলে হয়তো গানটি সরানো হতো না।
তার ভাষায়, তিনি কোনও প্রভাবশালী পরিবার থেকে আসেন না, বা তার হাতে তেমন ক্ষমতাও নেই যে নিজের মতামত জোর করে প্রতিষ্ঠা করবেন। তাই এই বিতর্কের জোরেই গানটি বন্ধ হওয়ায় তিনি স্বস্তি পেয়েছেন।
একভাবে বললে, ঝামেলা হলেও শেষটা তার জন্য ভালোই হয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও উঠে এসেছে একটি পুরনো প্রশ্ন—বলিউড কি অতিরিক্ত অশ্লীলতার দিকে যাচ্ছে?
কিছু সমালোচক মনে করেন, জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য অনেক সময় সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে নির্মাতারা। অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাউতও মন্তব্য করেন, বলিউড অশ্লীলতার সব সীমা পেরিয়ে গেছে।
আবার অন্যদিকে অনেকেই বলেন, এটা ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। কেউ দেখবে, কেউ দেখবে না—এটাই স্বাভাবিক।

এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—শিল্পের স্বাধীনতা আর সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য কোথায়?
একদিকে শিল্পীরা নতুন কিছু করতে চান, দর্শকদের আকৃষ্ট করতে চান। অন্যদিকে সমাজের একটা অংশ মনে করে, কিছু সীমা থাকা দরকার।
ধরো, তুমি একটা সিনেমা বানালে। তুমি চাইবে মানুষ সেটা দেখুক। কিন্তু যদি সেটা এমন কিছু হয়, যা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর লাগে, তাহলে সেটা কি ঠিক হবে? এখানেই আসে সেই ভারসাম্যের প্রশ্ন।
নোরা ফতেহির এই বিতর্কিত গান নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা শুধু একটি গান নিয়ে নয়। এটা আসলে বড় একটি আলোচনার অংশ—শিল্পের স্বাধীনতা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং দর্শকের দায়িত্ব।
এই ঘটনা দেখিয়ে দিল, আজকের দিনে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে সংসদ—সব জায়গাতেই মানুষের মতামতের গুরুত্ব আছে। আর সেই মতামতই কখনও কখনও বড় সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, বিষয়টা খুব সহজ—যা তৈরি করা হচ্ছে, সেটা যেন সবার জন্য গ্রহণযোগ্য হয়। না হলে বিতর্ক তো হবেই।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

