Homeনির্বাচনভোট দিতে ভয়! সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা, কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলো

ভোট দিতে ভয়! সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা, কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলো

সংখ্যালঘুদের ভোট নিয়ে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—নিরাপত্তা। মানুষ ভোট দিতে চায়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চায়। কিন্তু যখন ভোটের সঙ্গে জীবন-মরণের ভয় জড়িয়ে যায়

Share

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন মানেই শুধু ভোট নয়, অনেকের জন্য এটি হয়ে ওঠে টিকে থাকার লড়াই। বিশেষ করে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের কাছে ভোটের প্রশ্নটি আজ আর কেবল পছন্দের প্রার্থী বেছে নেওয়ার বিষয় নয়। এটি সরাসরি জড়িয়ে গেছে নিরাপত্তা, অস্তিত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সংখ্যালঘু ভোটারদের মনে জমে থাকা সেই দোলাচল আর আতঙ্কই উঠে এসেছে যশোরের অভয়নগরের সাধারণ মানুষদের কণ্ঠে।

‘কাকে ভোট দেব, আর কোথায় নিরাপদ থাকব?’

“আমরা যদি বিএনপিরে ভোট দিই, তালি আমাগে জামাত আইসে ধরে বসবে। আর যদি জামাতরে ভোট দিই, তালি বিএনপি আইসে ধরে বসবে। কোন দিকে যাবো আমরা কন?”—এই প্রশ্নে লুকিয়ে আছে অসহায়ত্ব, ক্ষোভ আর ভয়। যশোরের অভয়নগরের ডহরমসিয়াহাটি গ্রামের বাসিন্দা নির্মল বিশ্বাসের এই কথাগুলো আসলে একজন মানুষের নয়, একটি সম্প্রদায়ের মনের কথা।

একই গ্রামের শিউলি বিশ্বাসের কথায় সেই অনুভূতিটা আরও স্পষ্ট হয়। তিনি বলেন, “আমরা হিন্দু মানুষ। ব্যালটে সিল দিলেও কেউ বিশ্বাস করে না। আমাদের মনে করে হিন্দু মানেই নৌকার ভোট। আমরা যেন বলের মতো, যেদিকে যাই সেদিকেই লাথি খাই।” এই বাস্তবতাই আজ সংখ্যালঘু ভোটারদের সবচেয়ে বড় সংকট।

আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘর, পোড়া ভরসা

নির্মল ও শিউলি বিশ্বাস শুধু ভোটার নন, তারা সহিংসতার প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী। গত বছরের মে মাসে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তাদের গ্রামে ঘটে ভয়াবহ ঘটনা। হিন্দু অধ্যুষিত মতুয়া সম্প্রদায়ের ওই গ্রামে ১৮টি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই আগুন শুধু ঘরবাড়িই পোড়ায়নি, পুড়িয়ে দিয়েছে মানুষের নিরাপত্তার অনুভূতিও।

এই অভিজ্ঞতার পর ভোট মানে তাদের কাছে আর উৎসব নয়, বরং নতুন করে ভয় পাওয়ার নাম। শিউলি বিশ্বাস স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা ভোট দিতে যাব। কিন্তু যেই আমাদের নিরাপত্তা দেবে, আমরা তাকেই ভোট দেব।”

গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচন, উদ্বেগ বাড়ছে কেন?

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু তফসিল ঘোষণার পর থেকেই একের পর এক সহিংস ঘটনার খবর সংখ্যালঘুদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বসতবাড়িতে আগুন, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ভালুকায় পিটিয়ে ও আগুন দিয়ে দিপু চন্দ্রকে হত্যা, পরপর কয়েকজন হিন্দু ব্যবসায়ী খুন—এই ঘটনাগুলো মানুষকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করছে, ভোটের দিন আসলে কতটা নিরাপদ?

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা রঞ্জন কর্মকার মনে করেন, ভোটের আগে ক্যাম্পেইন, ভোটের দিন এবং ভোটের পর—এই তিন ধাপেই সংখ্যালঘুদের জন্য একটি বিরূপ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তার ভাষায়, “সংখ্যালঘুদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জায়গা দিন দিন কমে যাচ্ছে। সহিংসতা চলছে, কিন্তু রাষ্ট্র সেটা ঠিকভাবে স্বীকার করছে না। বিচারহীনতা আমাদের ভয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।”

‘এটা কোনো রাজনীতি নয়, এটা অস্তিত্বের প্রশ্ন’

রঞ্জন কর্মকারের কথায় ক্ষোভ স্পষ্ট। তিনি বলেন, “আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে দেওয়া কোন রাজনীতি? এটা আমাদের দেশের রাজনীতির কালচার না। একজন মাইনরিটির ওপর আঘাত মানে শুধু একজন মানুষ না, পুরো পরিবার, পুরো এলাকা, এমনকি পুরো দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

তার মতে, আজ সংখ্যালঘুরা অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। তারা ভোট দিতে চায়, অংশ নিতে চায়, কিন্তু প্রশ্ন একটাই—নিরাপত্তা কোথায়?

পরিসংখ্যান বলছে, আতঙ্কের কারণ আছে

পাঁচই আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর আড়াই হাজারের বেশি হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটা সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি ভয়, একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

চট্টগ্রামের রাউজানে সম্প্রতি কয়েকটি হিন্দু ও বৌদ্ধ বসতবাড়িতে বাইরে থেকে দরজা আটকে আগুন দেওয়ার ঘটনায় সেই আতঙ্ক আরও বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মিঠুন শীল জানান, এসব ঘটনার পর থেকে তারা রাতে পালাক্রমে বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছেন। ভোটের আগে এমন পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবে মানুষকে আরও ভীত করে তুলছে।

ভোটের আগে জীবন বাঁচানোই কি বড় অগ্রাধিকার?

ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও বলেন, “ভালুকার ঘটনাটা দেখেন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই একজন মানুষকে পিটিয়ে, পরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হলো। এই ঘটনাগুলো আমাদের স্বাভাবিকভাবেই শঙ্কিত করে।”

তার মতে, ভোটের আগে তার সবচেয়ে বড় চিন্তা জীবন রক্ষা। “আমার জীবন আর পরিবার নিরাপদ না থাকলে ভোটের কথা পরে ভাবব।” এই কথাগুলোই দেখায়, সংখ্যালঘুদের কাছে ভোটাধিকার প্রয়োগ আজ কতটা শর্তসাপেক্ষ হয়ে গেছে।

সংখ্যালঘু ভোট: নির্বাচনের বড় ফ্যাক্টর

বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে সংখ্যালঘু ভোট বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। ঐক্য পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৮০টি সংসদীয় আসনে জয়-পরাজয়ে সংখ্যালঘু ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সেই ভোট তখনই প্রয়োগ হবে, যখন ভোটাররা নিজেদের নিরাপদ মনে করবে।

নির্মল রোজারিও স্পষ্ট করে বলেন, “ভোট দিতে মানুষ তখনই যাবে, যখন সে দেখবে ভোট দেওয়ার কারণে কোনো হুমকি নেই। ২০০১ সালের নির্বাচনের রেফারেন্স আজও আমরা টানি। আমরা চাই না ২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়েও ভবিষ্যতে এমন রেফারেন্স তৈরি হোক।”

রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সংখ্যালঘুদের প্রত্যাশা

বর্তমান পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘুদের দাবি শুধু সরকারের কাছে নয়, সব রাজনৈতিক দলের কাছেই। রঞ্জন কর্মকার বলেন, “আমরা চাই সব রাজনৈতিক দল কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষণা দিক—নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘুদের ওপর কোনো নির্যাতন হবে না। যেখানেই তারা ভোট দিক, যে দলেই যাক, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।”

তার অভিযোগ, এখন পর্যন্ত এমন কোনো স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। ফলে আশ্বাসের জায়গাটা ফাঁকা থেকেই যাচ্ছে।

বিএনপি ও জামায়াত কী বলছে?

সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলার বেশিরভাগ ঘটনাই রাজনৈতিক কারণে ঘটেছে বলে দাবি বিএনপির। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, “বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অনেক উঁচু মানের। এখানে সাম্প্রদায়িক কারণে সহিংসতা হয় না, যা হয় তা রাজনৈতিক।”

তিনি আরও বলেন, ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে দলের চেয়ে প্রার্থীর ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রার্থী কতটা আস্থা তৈরি করতে পারে, তার ওপরই ভোট নির্ভর করে।

অন্যদিকে, জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “হিন্দু মানেই আওয়ামী লীগ, জামায়াত মানেই এন্টি হিন্দু—এই ধারণাগুলো এখন আর নেই। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সংখ্যালঘুরা নতুন করে ভাবার সুযোগ পেয়েছে।”

তিনি দাবি করেন, জামায়াত জিতলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, এমনকি বিএনপি জিতলেও জামায়াত সংখ্যালঘুদের পাশে থাকবে।

শেষ কথা: ভোট, ভয় আর ভবিষ্যৎ

সংখ্যালঘুদের ভোট নিয়ে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—নিরাপত্তা। মানুষ ভোট দিতে চায়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চায়। কিন্তু যখন ভোটের সঙ্গে জীবন-মরণের ভয় জড়িয়ে যায়, তখন সেই অধিকার আর সহজ থাকে না।

এই নির্বাচন সংখ্যালঘুদের জন্য শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিই একটি ফ্রি ও ফেয়ার নির্বাচন চায়, তাহলে আগে এই ভয় দূর করতে হবে। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া ভোটের উৎসব কখনোই সবার জন্য উৎসব হয়ে উঠতে পারে না।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন