বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের নাম শুধু পেশার পরিচয় নয়, বরং এক ধরনের নৈতিক অবস্থানের প্রতীক। মোনাজাতউদ্দিন ঠিক তেমনই একজন মানুষ। তিনি শুধু সংবাদ লিখতেন না, তিনি সংবাদ বাঁচতেন। তাঁর কলম ছিল শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বর, তাঁর চোখ ছিল অবহেলিত জনপদের আয়না। আজ তাঁর মৃত্যু দিবসে তাঁকে স্মরণ করা মানে দায়বদ্ধ সাংবাদিকতার প্রকৃত অর্থকে আবার নতুন করে বোঝার চেষ্টা করা।
শ্রমের মর্যাদা ও দায়বদ্ধতার দর্শন
রুশ কবি ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি একবার বলেছিলেন, তিনি বিদ্যা-শ্রমিক। সেই কথার ভেতরে লুকিয়ে ছিল শ্রমের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে মোনাজাতউদ্দিন বলেছিলেন, “আমি শ্রমিক, লিখে খাই।” কথাটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে আছে পেশার প্রতি নিখাদ সততা। তিনি জানতেন, কর্তৃপক্ষ তাঁর শ্রম কেনে। তবু তিনি চেষ্টা করতেন সিনসিয়ার থাকতে। এই চেষ্টাটাই আসলে দায়বদ্ধতা।
মায়াকোভস্কির দায়বদ্ধতা গড়ে উঠেছিল আদর্শিক পাঠ আর তাত্ত্বিক চর্চা থেকে। আর মোনাজাতউদ্দিনের দায়বদ্ধতা জন্ম নিয়েছিল জীবন থেকে। মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে দেখা অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে সত্য কীভাবে লিখতে হয়। সে কারণেই তাঁকে বলা যায় স্বনির্মিত মানুষ। নিজের হাতে নিজেকে তৈরি করা মানুষদের কাজের ধরনও আলাদা হয়। মোনাজাতউদ্দিন তার ব্যতিক্রম ছিলেন না।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই সাংবাদিকতার শীর্ষে
মোনাজাতউদ্দিনের সাংবাদিকতায় কোনো ঝকঝকে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির জৌলুস ছিল না। ছিল নিরন্তর সাধনা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা আর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা। তিনি প্রমাণ করেছেন, সাংবাদিক হতে হলে আগে মানুষ হতে হয়। গ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মানুষের দুঃখ কোথায় লুকিয়ে থাকে।
একসময় শহুরে সাংবাদিকদের মধ্যে মফস্বল সাংবাদিকতা নিয়ে এক ধরনের অবজ্ঞা ছিল। মনে করা হতো, গ্রামের খবর মানে ছোট খবর। মোনাজাতউদ্দিন একা হাতে সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, মফস্বলের একটি খবরও জাতীয় সংবাদপত্রের প্রধান শিরোনাম হতে পারে, যদি সেটার ভেতরে মানুষের সত্যিকারের জীবন থাকে।
পথে পথে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ
মোনাজাতউদ্দিনের পেশা আর নেশা ছিল একটাই—সংবাদ সংগ্রহ। তিনি বসে বসে ডেস্কে খবর বানাননি। হেঁটেছেন, উঠেছেন বাসে, নৌকায়, কখনো বা পায়ে হেঁটে পৌঁছেছেন প্রত্যন্ত গ্রামে। বিশেষ করে উত্তর বাংলার জনপদ ছিল তাঁর নিয়মিত কর্মক্ষেত্র। তবে পুরো বাংলাদেশই ছিল তাঁর প্রতিবেদনের মানচিত্র।
তিনি চকচকে শহুরে জীবনের দিকে তাকাননি। তাঁর চোখ ছিল রুক্ষ মাটিতে, অনাবাদী জমিতে, ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে। মানুষের পরিপাটি পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কঙ্কালসার জীবনের গল্প তিনি তুলে এনেছেন অকপটে। এই জায়গাটাতেই তাঁর সাংবাদিকতা আলাদা হয়ে ওঠে।
সাহসী কলম ও ঋজু ভাষার শক্তি
মোনাজাতউদ্দিনের লেখার ভাষা ছিল সহজ, সরল আর সোজাসাপ্টা। তিনি জটিল শব্দে সত্য ঢেকে রাখতেন না। প্রশাসনের গাফিলতি, ক্ষমতাবানদের দাপট, সমাজের দগদগে ক্ষত—সবকিছু তিনি এমনভাবে লিখতেন যে পাঠক নাড়া খেতেন। তাঁর লেখা পড়ে প্রথমে লজ্জা লাগত, কখনো বুকের ভেতর মোচড় দিত। তারপর ধীরে ধীরে পাঠকের ভেতরে জন্ম নিত প্রতিবাদের শক্তি।
এটাই একজন বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকের বড় সাফল্য। তিনি শুধু তথ্য দেননি, তিনি বিবেক জাগিয়েছেন। তাঁর প্রতিবেদনে পাঠক মাথা নিচু করত, আবার শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াত।
সংবাদ ছাড়াও সংবাদশিল্পের চিন্তা
মোনাজাতউদ্দিন শুধু খবর লিখেই থেমে যাননি। খবরের পেছনের মানুষগুলো, সংবাদ সংগ্রহের প্রক্রিয়া, সাংবাদিকতার সামগ্রিক কল্যাণ—সবকিছুই তাঁর ভাবনায় ছিল। তিনি জানতেন, একটি ভালো সংবাদ তৈরি হয় অনেক মানুষের শ্রমে। সেই শ্রমের সম্মান রক্ষা করাও একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব।
তাঁর প্রকাশিত লেখাগুলো পড়লেই বোঝা যায়, তিনি কতটা যত্ন নিয়ে প্রতিটি বিষয় দেখতেন। কোথাও বাড়তি নাটক নেই, কোথাও অপ্রয়োজনীয় রংচং নেই। আছে শুধু সত্য।
দায়বদ্ধ সাংবাদিকতার উত্তরাধিকার
আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে মোনাজাতউদ্দিনকে স্মরণ করা খুব জরুরি। যখন সংবাদ অনেক সময় পণ্য হয়ে যায়, তখন তাঁর মতো সাংবাদিক আমাদের মনে করিয়ে দেন কেন এই পেশাটা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, সাংবাদিকতা মানে ক্ষমতার পাশে দাঁড়ানো নয়, সাংবাদিকতা মানে মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
তাঁর মতো পেশার প্রতি এতটা আন্তরিক, এতটা নিষ্ঠাবান সাংবাদিক খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন। তিনি ছিলেন সার্বক্ষণিক সংবাদকর্মী। সংবাদই ছিল তাঁর জীবন।
মৃত্যু দিবসে গভীর শ্রদ্ধা
আজ মোনাজাতউদ্দিনের মৃত্যু দিবস। তিনি হয়তো নেই, কিন্তু তাঁর লেখা আছে। তাঁর আদর্শ আছে। গ্রামের কোনো নিরন্ন মানুষের চোখে আজও যদি কেউ সাহস খুঁজে পায়, সেটার পেছনে মোনাজাতউদ্দিনের মতো সাংবাদিকদের অবদান আছে।
এই দিনে তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, কলমও এক ধরনের শ্রম। আর সেই শ্রম যদি সৎ হয়, তাহলে সেটাই বদলে দিতে পারে অনেক কিছু।
লেখক: সাজেদ রহমান।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

