Homeভ্রমণ ও পর্যটনঝিনাইদহের নলডাঙ্গায় বেগবতী নদী: ইতিহাস, প্রকৃতি আর নীরবতার এক অপূর্ব বিকেল

ঝিনাইদহের নলডাঙ্গায় বেগবতী নদী: ইতিহাস, প্রকৃতি আর নীরবতার এক অপূর্ব বিকেল

এটি একটি অনুভূতি, একটি ইতিহাস, একটি জীবন্ত স্মৃতি। যে কেউ যদি এক বিকেলের জন্য এখানে এসে বসে, বুঝতে পারবে—

Share

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নলডাঙ্গা—নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক শান্ত জনপদ, যেখানে ইতিহাস আর প্রকৃতি হাত ধরাধরি করে হাঁটে। এই এলাকার মন্দিরপাড়া ঘেঁষে বয়ে চলেছে বেগবতী নদী। এক সময় যার নামেই ছিল প্রবল স্রোতের ইঙ্গিত, আজ সেই নদী অনেকটাই নরম, শান্ত, সংযত। তবু তার ভেতরে জমে আছে সময়ের গল্প, মানুষের স্মৃতি আর নিসর্গের গভীর ভাষা।

নলডাঙ্গার রাজবাড়ি ও প্রাচীন মন্দিরগুলোর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বেগবতী নদী যেন একটু থেমে দাঁড়ায় এখানে। নদীর প্রস্থ খানিকটা বেড়ে যায়, স্রোত হয় ধীর। মনে হয়, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে নদীটি এখানে এসে নিঃশ্বাস নেয়। মন্দিরের ইটের দেয়াল, শ্যাওলা ধরা ঘাট আর নদীর বাঁক—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অদ্ভুত দৃশ্য। এই দৃশ্য শুধু চোখে দেখা যায় না, অনুভব করতে হয় মন দিয়ে।

একসময় এই নদীর স্রোত ছিল প্রচণ্ড। সেই কারণেই এর নাম বেগবতী। এখন নদীর সেই বেগ অনেকটাই কমে গেছে। তবু বর্ষাকালে নদীর রূপ বদলে যায়। তখন আবার বোঝা যায়, নামের ভেতরের শক্তি এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

বড় নদীর বিশালতা মানুষকে মুগ্ধ করে, ভয়ও জাগায়। কিন্তু ছোট নদীর সঙ্গে সম্পর্কটা আলাদা। এখানে দূরত্ব নেই, আছে কাছাকাছি থাকার অনুভূতি। বেগবতীর দুই পাড়ের গাছগুলো যেন নদীটাকে আপন করে নেয়। ডালপালা নুয়ে পড়ে পানির দিকে। হালকা বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ নদীর জলের সঙ্গে মিশে যায়।

এই নদীর ধারে দাঁড়ালে মনে হয়, প্রকৃতি খুব কাছ থেকে কথা বলছে। মাছরাঙা পাখি এখানে কেবল ছবি নয়, চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এক জীবন্ত দৃশ্য। গাছের ডালে বসে তারা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জলের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ এক ঝাঁপ, ঠোঁটে রুপালি মাছ, তারপর আবার উড়ে গিয়ে বসে। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই নদীর জীবন।

নলডাঙ্গায় কাটানো এই বিকেল শুধু প্রকৃতির সঙ্গে কাটানো সময় নয়। এখানে জড়িয়ে আছে চিন্তা আর সংস্কৃতি। বুদ্ধিবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র ‘চিন্তা প্রকাশ’-এর সঙ্গে এই সফর ছিল এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। দুপুরের খাবারের পর নদীর কূলে পাটি পেতে বসা। কেউ গান ধরলেন, কেউ কবিতা আবৃত্তি করলেন, কেউ আবার গভীর আলোচনায় মেতে উঠলেন।

নদীর হাওয়ায় ভেসে এলো সুর, শব্দ আর ভাবনার ঢেউ। এখানে বুদ্ধিবৃত্তি কোনো কঠিন আলোচনার বিষয় হয়ে থাকেনি। বরং তা হয়ে উঠেছে অনুভূতির অংশ। প্রকৃতির মাঝখানে বসে কথা বললে চিন্তাও যেন নরম হয়ে আসে। কথাগুলো সহজ হয়, গভীর হয়।

এইসব আয়োজনের ফাঁকে আমি একটু দূরে সরে গিয়েছিলাম। নদীর পাড় ধরে হেঁটে বেড়িয়েছি। কোথাও ভাঙা ঘাট, কোথাও নরম বালু, কোথাও জলছবি আঁকা। ক্যামেরায় বন্দি করেছি সেই মুহূর্তগুলো। চেষ্টা করেছি প্রকৃতির ফ্রেমে ইতিহাসকে ধরে রাখতে।

নলডাঙ্গার মন্দির, রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ আর নদীর বাঁক—সব মিলিয়ে ছবিগুলো যেন সময়ের দলিল। হয়তো বছর পরে কেউ এই ছবি দেখে বুঝবে, কেমন ছিল বেগবতীর এক শান্ত বিকেল।

বেগবতী নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। এটি মূলত ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৩ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ প্রায় ৩২ মিটার। সর্পিলাকার এই নদী মাথাভাঙা নদীর একটি শাখা।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায় বেগবতী নদী দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৬৩ হিসেবে চিহ্নিত। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কুমড়াবাড়ি ইউনিয়নের বিলাঞ্চল থেকে এর উৎপত্তি। সেখান থেকে নদীটি কবাই, হানুয়া, আঙ্গারিয়া, মুরাদিয়া, নলডাঙ্গা ও কোলা বাজারের বড় বায়সা গ্রাম অতিক্রম করে মাগুরা সদর উপজেলার রাঘবদাইর ইউনিয়নে পৌঁছে ফটকি নদীতে মিশেছে।

বেগবতী একটি মৌসুমি নদী। শুকনো মৌসুমে নদীটি প্রায় নীরব থাকে। অনেক জায়গায় জল কেবল সরু রেখা হয়ে দেখা দেয়। কোথাও কোথাও নদীর বুক শুকিয়ে স্মৃতির মতো পড়ে থাকে। তখন নদীর তীর ঘেঁষে হাঁটলে বোঝা যায়, প্রকৃতিও ক্লান্ত হয়।

কিন্তু বর্ষা এলেই দৃশ্য পাল্টে যায়। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে নদীর জল বাড়ে। স্রোত ফিরে আসে। তীরবর্তী অঞ্চল প্লাবিত হয়। নদী যেন আবার নিজের পুরোনো চেহারা ফিরে পায়। তখনই বোঝা যায়, বেগবতীর ভেতরের শক্তি এখনও জীবিত।

নলডাঙ্গার মন্দিরগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে মনে হয়, এই নদী সব দেখেছে। রাজাদের উত্থান-পতন, মানুষের জীবনযাপন, উৎসব, সংকট—সবকিছুর নীরব সাক্ষী বেগবতী। রাজবাড়ির ইট, মন্দিরের দেয়াল আর নদীর বাঁক একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে এক অবিচ্ছিন্ন ইতিহাস।

এই নদীর পাড়ে বসে সময় কাটানো মানে নিজের সঙ্গে একটু কথা বলা। এখানে কোনো তাড়া নেই, নেই কোলাহল। আছে শুধু জল, বাতাস আর স্মৃতির গন্ধ।

বেগবতী নদীর তীরে কাটানো এই বিকেল ছিল আত্মার জন্য একটুকু অবকাশ। চিন্তার জন্য একটু জায়গা। প্রকৃতির সঙ্গে এক নীরব কথোপকথন। এমন সময়গুলো মানুষকে আবার নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে।

ঝিনাইদহের নলডাঙ্গায় বেগবতী নদী শুধু একটি জলধারা নয়। এটি একটি অনুভূতি, একটি ইতিহাস, একটি জীবন্ত স্মৃতি। যে কেউ যদি এক বিকেলের জন্য এখানে এসে বসে, বুঝতে পারবে—কেন এই নরম স্রোতের নদী আজও মানুষের মনে গভীর জায়গা করে আছে।

লেখক: সাজেদ বকুল, সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন