আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো কড়া নিরাপত্তার জায়গায় এমন ঘটনা যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না অনেকে। ব্যাগ ও টিকিট পরীক্ষার অজুহাতে এক বিদেশি তরুণীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে তুমুল হইচই পড়ে গেল বেঙ্গালুরু বিমানবন্দরে। অভিযুক্ত এক বিমানকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই ঘটনাকে ঘিরে প্রশ্ন উঠছে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং যাত্রী সুরক্ষা নিয়ে।
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, নির্যাতিতার নাম কিম সুং কিউং। তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার বাসিন্দা। কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। ঘোরাঘুরি শেষে গত সোমবার নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য বেঙ্গালুরু বিমানবন্দর থেকে তাঁর ফ্লাইট ছিল।
সবকিছু স্বাভাবিকই চলছিল। ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়াও নির্বিঘ্নে শেষ হয়। কিন্তু টার্মিনালের দিকে এগোনোর সময়ই ঘটে যায় ভয়ংকর অভিজ্ঞতা, যা কিম সারাজীবন ভুলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় মহাম্মদ আফফান নামে এক বিমানকর্মী কিমের পথ আটকান। তিনি নিজেকে কর্তব্যরত কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রথমে কিমের বিমানের টিকিট দেখতে চান। এরপর দাবি করেন, কিমের চেক-ইন ব্যাগ থেকে নাকি অস্বাভাবিক শব্দ আসছে এবং সেটি পরীক্ষা করা জরুরি।
বিদেশি হওয়ায় এবং পরিস্থিতির চাপে পড়ে কিম প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন, এটি হয়তো নিয়মেরই অংশ। এখানেই সুযোগ নেয় অভিযুক্ত বিমানকর্মী।
তরুণীর অভিযোগ, আফফান তাঁকে আলাদা করে তল্লাশির কথা বলে মহিলা শৌচাগারের দিকে নিয়ে যান। কিম একাধিকবার আপত্তি জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, তিনি এই ধরনের তল্লাশিতে স্বচ্ছন্দ নন। তবুও অভিযুক্ত কোনও কথাই শোনেননি।
কিমের দাবি, ওই শৌচাগারের ভেতরে নিয়ে গিয়ে আফফান তাঁকে অশালীনভাবে স্পর্শ করেন। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন কিম প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। অভিযোগ, তখন অভিযুক্ত তাঁকে জোর করে জড়িয়ে ধরেন। এরপর হঠাৎ করেই “ধন্যবাদ” বলে সেখান থেকে বেরিয়ে যান, যেন কিছুই ঘটেনি।
এই আচরণে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন কিম। তিনি মানসিকভাবে ভীষণভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
ঘটনার পরই কিম দেরি না করে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মীদের বিষয়টি জানান। বিদেশি হয়েও তিনি সাহস হারাননি। সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীরা তৎপরতা দেখান এবং অভিযুক্তকে আটক করা হয়।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। গোটা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখতে শুরু হয়। বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজও পরীক্ষা করা হয়, যাতে ঘটনার সত্যতা যাচাই করা যায়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সিসিটিভি ফুটেজে অভিযুক্ত বিমানকর্মীর গতিবিধি ধরা পড়েছে। কিমের অভিযোগের সঙ্গে ফুটেজের মিল পাওয়ায় পুলিশ নিশ্চিত হয় যে অভিযোগ ভিত্তিহীন নয়। এরপরই মহাম্মদ আফফানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বর্তমানে অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। কীভাবে সে এই ধরনের কাজ করার সাহস পেল এবং এর আগে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে কি না, সেই দিকগুলিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনা সামনে আসতেই বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। যাত্রীদের ব্যাগ পরীক্ষা বা তল্লাশির জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। বিশেষ করে কোনও মহিলা যাত্রীর ক্ষেত্রে পুরুষ কর্মীর এমন আচরণ সম্পূর্ণ বেআইনি।
অনেকেই বলছেন, যদি একজন বিদেশি পর্যটক এভাবে হেনস্তার শিকার হন, তাহলে দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পর্যটন ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, “বিমানবন্দর কি আর নিরাপদ নয়?” কেউ কেউ আবার কিমের সাহসের প্রশংসা করেছেন, কারণ তিনি চুপ করে না থেকে সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করেছেন।
অনেকে দাবি তুলেছেন, বিমানবন্দরের কর্মীদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া আরও কড়া করা উচিত। বিশেষ করে যাত্রীদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মীদের আচরণ ও মানসিকতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা দরকার।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানি এবং বিশ্বাসভঙ্গের ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রয়োজনে আরও ধারাও যোগ করা হতে পারে।
এদিকে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তরফ থেকেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে। অভিযুক্ত কর্মী কোন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং কীভাবে তিনি যাত্রীদের সঙ্গে একা থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বেঙ্গালুরু বিমানবন্দরে কোরিয়ান তরুণীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি যাত্রী সুরক্ষার বড় ব্যর্থতার দিকটিও তুলে ধরেছে। ব্যাগ পরীক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়কে অজুহাত করে একজন কর্মীর এমন আচরণ সমাজের জন্য ভয়ংকর বার্তা দেয়।
তবে একই সঙ্গে কিম সুং কিউং-এর সাহসও নজির গড়েছে। তিনি চুপ না থেকে আইনের দ্বারস্থ হয়েছেন। এখন সকলের আশা, দোষীর কঠোর শাস্তি হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে কোনও যাত্রীকে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি না হতে হয়, সে জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

