Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফুটবলবিশ্বকাপের আগে নেইমার কেন বারবার বিতর্কে? প্রেম, কেলেঙ্কারি আর পতনের গল্প

বিশ্বকাপের আগে নেইমার কেন বারবার বিতর্কে? প্রেম, কেলেঙ্কারি আর পতনের গল্প

Share

নেইমার জুনিয়র। নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ড্রিবল, গতি আর দর্শক মাতানো গোল। এক সময় যাঁকে ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ রাজা বলা হতো, আজ তাঁর নামের সঙ্গে বেশি জুড়ে যাচ্ছে বিতর্ক, অভিযোগ আর অনিশ্চয়তা। ফুটবল বিশ্বে বহু বছর ধরেই একটি কথা শোনা যায়—“প্রিন্স, হু নেভার বিকেম কিং।” কেন নেইমার রাজা হতে পারলেন না? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর চোট, সিদ্ধান্ত এবং মাঠের বাইরের জীবনযাপনে।

২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি নেইমার পা দিলেন ৩৪ বছরে। বয়সটা ফুটবলারের জন্য খুব বেশি নয়, কিন্তু নেইমারের ক্ষেত্রে চোট যেন নিত্যসঙ্গী। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে তাঁকে আদৌ দেখা যাবে কি না, তা নিয়েই সংশয়। খেললেও অনেকেই মনে করেন, সেটাই হবে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ।

ইউরোপ ছেড়ে তিনি ফিরে গেছেন শৈশবের ক্লাব স্যান্টোসে। উদ্দেশ্য একটাই—নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলা। কিন্তু চোট তাঁকে সেখানেও নিয়মিত খেলতে দিচ্ছে না। ব্রাজিল জাতীয় দলের সম্ভাব্য কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাঁকে দলে নেবেন কি না, সেটাও এখন বড় প্রশ্ন।

নেইমার বারবার বলেছেন, তিনি বদলাতে চান। পরিবার, সন্তান আর দায়িত্বশীল জীবনের কথা বলেছেন বহুবার। কিন্তু অতীতের ঘটনাগুলো আজও তাঁকে পিছু ছাড়ছে না।

Images 10000 01

২০১৬ সালে নিউইয়র্কের এক হোটেলে যৌন হেনস্তার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগকারিণী ছিলেন হোটেলেরই এক কর্মী। তাঁর দাবি, একটি ইভেন্ট চলাকালীন নেইমার তাঁকে রুমে ডেকে নিয়ে জোর করে অশালীন আচরণ করেন। এই অভিযোগের সরাসরি প্রভাব পড়ে নেইমারের পেশাগত জীবনে।

এই ঘটনাটি ঘটে একটি বড় স্পোর্টস ব্র্যান্ডের আয়োজনে। ফলাফল হিসেবে ১৫ বছরের দীর্ঘ চুক্তি বাতিল করে নাইকি। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নেইমারের ভাবমূর্তিও বড় ধাক্কা খায়। পরে তিনি পুমার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন, কিন্তু সেই ক্ষত সহজে ভরাট হয়নি।

২০১৯ সাল নেইমারের জীবনে আরেকটি অন্ধকার অধ্যায়। এক তরুণী তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনেন। বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর। ভিডিওতে দেখা যায়, এক যুবক ও এক যুবতী হোটেল রুমে প্রবেশ করছেন। পরে তাঁদের মধ্যে তীব্র বাগ্‌বিতণ্ডা ও শারীরিক সংঘর্ষ হয়।

অভিযোগকারিণীর দাবি ছিল, নেইমার তাঁকে দুপুরে হোটেলে ডেকে পাঠান এবং তাঁর সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্কে জড়ান। তিনি বলেন, নেইমার উত্তেজিত হয়ে জোর করে তাঁকে হেনস্তা করেন। অন্যদিকে নেইমার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং বলেন, তিনি আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছিলেন।

এই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম হয়। ফুটবল মাঠের বাইরের এই কেলেঙ্কারি নেইমারের ইমেজকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বার্সেলোনা থেকে পিএসজি, সেখান থেকে সৌদি ক্লাব আল হিলাল—ক্লাব বদলালেও নেইমারের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিতর্ক থামেনি। বান্ধবী ব্রুনা বিয়ানকার্ডির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক একসময় তাঁকে ‘সংসারী’ ভাবমূর্তি দিয়েছিল।

ব্রুনা যখন অন্তঃসত্ত্বা, তখনই সামনে আসে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ। শোনা যায়, তাঁর অনুপস্থিতিতে নেইমার একাধিক এসকর্টের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। সংখ্যা নিয়ে নানা দাবি ওঠে, যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

প্রথমবার এই ঘটনায় নেইমার প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। কিন্তু পরবর্তীতে ওঠা অভিযোগ তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করেন। এই দ্বৈত অবস্থান তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ব্রাজিলিয়ান এসকর্ট ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার নাইরা মাসেদা দাবি করেন, নেইমার তাঁর সঙ্গে এবং আরেক নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, এর জন্য মোটা অঙ্কের অর্থও দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তিনি গর্ভবতী হওয়ার কথাও বলেন।

এই খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। যদিও পরে নাইরা জানান, তাঁর সন্তানের বাবা নেইমার নন। তবুও এই ঘটনাটি নেইমারের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিতর্ককে আরও উসকে দেয়।

২০২৩ সালে অনলিফ্যানস মডেল কি আলভেস অভিযোগ করেন, নেইমার তাঁর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে আগ্রহ দেখান। শুধু তাই নয়, আলভেসের বোনকেও একই প্রস্তাব দেন বলে দাবি করেন তিনি।

২০২৪ সালে প্যারাগুয়ের সাঁতারু লুয়ানা আলোন্সো জানান, নেইমার তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বলতে না চাইলেও তাঁর মন্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তোলে। লুয়ানার বিরুদ্ধে আগে থেকেই গেমস ভিলেজে আচরণ নিয়ে অভিযোগ ছিল, যা পুরো বিষয়টিকে আরও জটিল করে তোলে।

Images 10000 03

অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞের মতে, প্রতিভার দিক থেকে নেইমারের ঘাটতি ছিল না। কিন্তু শৃঙ্খলা, সিদ্ধান্ত এবং ধারাবাহিকতা—এই তিন জায়গায় তিনি বারবার পিছিয়ে পড়েছেন। চোট তাঁকে থামিয়েছে, আর মাঠের বাইরের জীবন তাঁর ফোকাস নষ্ট করেছে।

মেসি ও রোনালদো যেখানে নিজেদের জীবনকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে ফুটবলের জন্য উৎসর্গ করেছেন, সেখানে নেইমারের জীবনে বিতর্ক বারবার প্রাধান্য পেয়েছে। এর ফলেই হয়তো তিনি রাজা হওয়ার দৌড়ে পিছিয়ে গেছেন।

নেইমার এখনও লড়াই করছেন। পরিবারকে সামনে রেখে নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু সময় খুব কম। ২০২৬ বিশ্বকাপই হতে পারে তাঁর শেষ বড় মঞ্চ। সেখানে তিনি কীভাবে নিজেকে তুলে ধরবেন, সেটাই ঠিক করবে তাঁর উত্তরাধিকার।

নেইমার কি শেষবারের মতো সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করতে পারবেন? নাকি বিতর্কই তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ পরিচয় হয়ে থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর দেবে সময়ই। তবে একথা নিশ্চিত, ফুটবল ইতিহাসে নেইমারের নাম থাকবে প্রতিভা আর বিতর্ক—দুটোরই মিশেলে।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন