মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ছোট একটা সিদ্ধান্তও পুরো বিশ্বের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক খবরে বলা হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প-কে সরাসরি ইরানে স্থল সেনা পাঠানোর জন্য চাপ দিচ্ছে মোহাম্মদ বিন সালমান। বিষয়টা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না—এটা পুরো অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।
চল একটু সহজ করে বুঝি—কেন এত চাপ, আর এতে কার কী লাভ বা ঝুঁকি আছে।
সৌদি যুবরাজের দৃষ্টিতে এই মুহূর্তটা একেবারে “গেম-চেঞ্জার”। তিনি মনে করছেন, ইরানের বর্তমান সরকার যদি এখনই দুর্বল করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে সেটি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
গত এক সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে একাধিক কথোপকথনে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন—এই যুদ্ধ অর্ধেক রেখে থামলে কাজ হবে না। পুরোপুরি শেষ করতে হবে। তার মতে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো বদলানো ছাড়া স্থায়ী শান্তি আসবে না।
একটু ভাবো, এটা ঠিক যেমন একটা সমস্যাকে অর্ধেক সমাধান করলে পরে আবার বড় হয়ে ফিরে আসে। সৌদি আরব ঠিক সেই ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
এখন প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প কী ভাবছেন?
ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে মনে করছেন, ইরানে পরিবর্তন আনা গেলে সেটা আমেরিকার জন্য বড় সাফল্য হতে পারে। কিন্তু অন্যদিকে তার বড় দুশ্চিন্তা—তেলের দাম।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যেখানে প্রতি গ্যালন জ্বালানির দাম ছিল ২.৯০ ডলার, এখন সেটা বেড়ে প্রায় ৪ ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধ আরও বাড়লে এই দাম আকাশ ছুঁতে পারে।
মানে, তুমি যেমন হঠাৎ বাজারে চাল-ডালের দাম বেড়ে গেলে চিন্তায় পড়ে যাও, ঠিক তেমনি একটা দেশের অর্থনীতিও নড়ে যায় তেলের দামে।
এই আলোচনায় একটা শব্দ বারবার আসছে—“রেজিম চেঞ্জ”।
সহজ ভাষায় বললে, এর মানে হলো কোনো দেশের বর্তমান সরকারকে সরিয়ে নতুন সরকার আনা।
খবরে বলা হচ্ছে, তিন সপ্তাহের টানা সংঘর্ষে ইরানের অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন, এমনকি সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনেই-এর নামও আলোচনায় এসেছে।
যদি সত্যিই এমন পরিবর্তন ঘটে, তাহলে সেটা শুধু ইরান নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে বদলে দিতে পারে।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে জ্বালানি খাতে।
বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যেই সতর্কতা জারি করেছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহে সমস্যা হলে পুরো বিশ্বে সংকট তৈরি হয়।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেছেন, এখনই আলোচনায় বসা জরুরি। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার জন্য দ্রুত সমাধান দরকার।
এই প্রণালীটা কেন গুরুত্বপূর্ণ জানো? বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এখান দিয়ে যায়। এটা বন্ধ থাকলে ভাবো কী অবস্থা!
পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা একটু সহজ করে বলি—
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে তাদের দেশ আলোচনার জায়গা হতে পারে।
ইরান নতুন করে নিরাপত্তা প্রধান নিয়োগ দিয়েছে। মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর এখন সেই দায়িত্বে।
এদিকে কাতার বলছে, এই যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পুরো ভেঙে দিয়েছে।
আরেকদিকে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে নতুন নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরির কথা বলছে।
এই যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যে আটকে নেই।
ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র জ্বালানি সংকটের কারণে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।
নিউজিল্যান্ড সরকার মানুষকে জ্বালানি কেনার জন্য নগদ সহায়তা দিচ্ছে।
ভিয়েতনাম তাদের অনেক ফ্লাইট বাতিল করছে জ্বালানির অভাবে।
মানে, একটা যুদ্ধ কিভাবে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশেও প্রভাব ফেলে—এটাই তার উদাহরণ।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, তারা লেবাননে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
তাদের দাবি, এই স্থাপনাগুলো হিজবুল্লাহ-এর নিয়ন্ত্রণে ছিল। হামলার ফলে অনেক জ্বালানি স্টেশন অচল হয়ে গেছে।
এটা দেখাচ্ছে, যুদ্ধ শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নেই—এটা ধীরে ধীরে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি খুবই সংবেদনশীল।
একদিকে সৌদি আরব চাইছে শক্ত অবস্থান নিতে, অন্যদিকে ট্রাম্প ভাবছেন অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে। এর মধ্যে পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে—পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হয়।
একটা ভুল সিদ্ধান্ত মানে হতে পারে বড় যুদ্ধ, আবার সঠিক সিদ্ধান্ত মানে শান্তির পথও খুলে যেতে পারে।
এখন প্রশ্নটা খুব সোজা—যুদ্ধ কি আরও বাড়বে, নাকি সবাই আলোচনার টেবিলে ফিরবে?
সময়ই সেটার উত্তর দেবে।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

