Homeবিশেষ প্রতিবেদনআমেরিকা-ইজরায়েলের চাপে কি দুর্বল ইরান? নতুন ‘গেমপ্ল্যান’ জানাল তেহরান!

আমেরিকা-ইজরায়েলের চাপে কি দুর্বল ইরান? নতুন ‘গেমপ্ল্যান’ জানাল তেহরান!

Share

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল যৌথভাবে হামলা চালানোর দাবি করছে, অন্যদিকে ইরান বলছে তারা এখনও তাদের শক্তি পুরোপুরি ব্যবহারই করেনি। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে যা দেখা যাচ্ছে, তার আড়ালে আরও বড় কৌশল লুকিয়ে আছে কি না—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্দরে।

যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে পৌঁছানোর পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শুরুতে যেভাবে বেপরোয়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছিল তেহরান, এখন সেই হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের কারণ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।

মার্কিন ও ইজরায়েলি সামরিক সূত্রের দাবি, তাদের যৌথ অভিযানে ইরানের সামরিক অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র বা মিসাইল লঞ্চারগুলোকে টার্গেট করে হামলা চালানো হয়েছে।

তাদের মতে, ইরানের প্রায় ৭৫ শতাংশ মিসাইল লঞ্চার ধ্বংস হয়ে গেছে। এই কারণেই এখন আগের মতো ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া সম্ভব হচ্ছে না। যুদ্ধের শুরুতে যেভাবে একের পর এক রকেট ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ছোড়া হচ্ছিল, বর্তমানে তার পরিমাণ প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

এই দাবির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল বোঝাতে চাইছে যে তাদের সামরিক কৌশল সফল হয়েছে। তাদের মতে, ইরানের আক্রমণক্ষমতা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।

কিন্তু তেহরান একেবারেই ভিন্ন কথা বলছে।

ইরান এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কমে যাওয়ার পেছনে কোনো দুর্বলতা নেই। বরং এটা পরিকল্পিত সামরিক কৌশলের অংশ।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-এর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সইদ মাজিদ মৌসভি বলেছেন, ইরান এখন যুদ্ধের নতুন ধাপে প্রবেশ করছে।

তার কথায়, “আমরা এখন থেকে এক টনের কম ওজনের যুদ্ধাস্ত্র বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করব না। আমাদের হামলার শক্তি এবং পরিধি দুটোই বাড়বে।”

এই বক্তব্য অনেক বিশ্লেষকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। কারণ এর অর্থ হতে পারে, ইরান ছোট ছোট হামলার বদলে বড় ও বিধ্বংসী আক্রমণের পরিকল্পনা করছে।

সহজভাবে বললে, আগের মতো ঘন ঘন হামলা না করে এখন হয়তো তারা কম সংখ্যক কিন্তু অনেক বেশি শক্তিশালী হামলা চালাতে চাইছে।

এই সংঘাতের আরেকটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে—ইরানের হাতে এখনও কত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে?

যুদ্ধের শুরুতে অনেক বিশ্লেষক বলেছিলেন, ইরানের কাছে কয়েক হাজার ব্যালিস্টিক মিসাইল থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তবে কতগুলো ব্যবহার হয়েছে আর কতগুলো এখনও মজুত আছে—তা স্পষ্ট নয়।

এই অনিশ্চয়তাই পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ যদি ইরানের হাতে এখনও বড় মজুত থাকে, তাহলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তা ব্যবহার করার সম্ভাবনাও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এবং প্রাক্তন তুর্কি কূটনীতিক সিনান উলগেন মনে করেন, ইরান এখন হিসেব করে পদক্ষেপ নিচ্ছে।

তার মতে, যুদ্ধ কতদিন চলবে তা কেউই নিশ্চিতভাবে জানে না। তাই ইরান হয়তো তাদের অস্ত্রভাণ্ডার দ্রুত শেষ করতে চাইছে না। বরং ধীরে ধীরে ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই অনেকেই ভাবছিলেন এটি হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে যুদ্ধ দ্রুত থামার সম্ভাবনা খুবই কম।

বিশেষ করে যখন দুই পক্ষই নিজেদের সাফল্যের দাবি করছে এবং একই সঙ্গে আরও বড় হামলার হুমকি দিচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ইতিহাস দেখলে একটা বিষয় বোঝা যায়—একবার বড় শক্তিগুলো সরাসরি জড়িয়ে পড়লে সংঘাত দ্রুত শেষ করা কঠিন হয়ে যায়।

বর্তমান পরিস্থিতিও অনেকটা সেই দিকেই এগোচ্ছে।

এই যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতেও আলোচনা কম নয়। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।

সোমবার এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কার্যত শেষ হয়ে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল এই সংঘাতে বড় সাফল্য পেয়েছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই বক্তব্যের মাত্র এক ঘণ্টা পর আরেকটি অনুষ্ঠানে গিয়ে তিনি ভিন্ন কথা বলেন।

সেখানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনও যুদ্ধ জেতেনি এবং পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলা যাবে না।

এই দুই বিপরীত মন্তব্য নিয়ে এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে রাজনৈতিক বক্তব্যও বারবার পাল্টে যাচ্ছে।

এই সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলই এখন অস্থির হয়ে উঠেছে।

কারণ এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং ইরানপন্থী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীও সক্রিয়।

ফলে পরিস্থিতি যেকোনো সময় আরও বড় আকার নিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। তখন শুধু ইরান ও ইজরায়েল নয়, আরও কয়েকটি দেশ সরাসরি জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—দুই পক্ষই এখনও যুদ্ধ থামানোর কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

ইরান বলছে তারা আরও শক্তিশালী হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীও সতর্কবার্তা দিয়েছে যে প্রয়োজন হলে আরও বড় আক্রমণ চালানো হবে।

এই পরিস্থিতিতে অনেক বিশ্লেষক বলছেন, বর্তমান শান্ত দেখানো সময়টা আসলে ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা হতে পারে।

যদি ইরান সত্যিই তাদের নতুন কৌশল অনুযায়ী ভারী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে, তাহলে যুদ্ধ আরও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ছোট একটি সিদ্ধান্তও বড় যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

মার্কিন-ইজরায়েল জোট বলছে তারা প্রায় জয়ের কাছাকাছি। কিন্তু ইরান বলছে তাদের আসল শক্তি এখনও ব্যবহারই করা হয়নি।

এই দুই বিপরীত দাবির মাঝখানে পুরো বিশ্ব এখন অপেক্ষা করছে—পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে?

কারণ পরের কয়েকটি দিনই হয়তো ঠিক করে দেবে, এই সংঘাত দ্রুত থামবে নাকি আরও বড় আকার নেবে।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন