Homeবিশেষ প্রতিবেদনএকুশে বইমেলা ২০২৬: আপত্তি, বর্জন আর শেষ মুহূর্তের নাটক—আসলে কী হচ্ছে?

একুশে বইমেলা ২০২৬: আপত্তি, বর্জন আর শেষ মুহূর্তের নাটক—আসলে কী হচ্ছে?

Share

ফেব্রুয়ারি মানেই বইমেলার গন্ধ। নতুন বইয়ের কালি, প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ, আর বন্ধুর সাথে বিকেলের আড্ডা—সব মিলিয়ে এক আলাদা আবেগ। কিন্তু ২০২৬ সালের একুশে বইমেলা ঘিরে সেই চেনা আনন্দের জায়গায় তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা, বিতর্ক আর টানাপোড়েন।

প্রতি বছর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আয়োজনে থাকে বাংলা একাডেমি। কিন্তু এবার নির্বাচন, রোজা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে মেলার দিনক্ষণ নিয়ে শুরু হয় টানটান পরিস্থিতি। শেষ পর্যন্ত ২৬ ফেব্রুয়ারি নতুন তারিখ ঠিক হলেও মাঝের সময়টা ছিল উত্তেজনায় ভরা।

এবারের জাতীয় নির্বাচন ছিল ১২ ফেব্রুয়ারি। নিরাপত্তাজনিত কারণে আগেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল, মেলা ফেব্রুয়ারিতে না করে ডিসেম্বরেই আয়োজন করা হবে। কিন্তু প্রকাশকদের একাংশ এবং ৩০টির বেশি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। তাদের দাবি ছিল—ভাষার মাসে বইমেলা না হলে সেই আবেগটাই হারিয়ে যাবে।

চাপে পড়ে ডিসেম্বরের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। পরে নির্বাচন শেষে ২০ ফেব্রুয়ারি নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তখনই শুরু হয় নতুন জট।

২০ ফেব্রুয়ারির সময়টায় রোজা শুরু হয়ে যায়। প্রকাশকদের বড় একটি অংশ মনে করে, রোজার মধ্যে মাসব্যাপী বইমেলা আয়োজন বাস্তবসম্মত নয়। তাদের যুক্তি ছিল সহজ—সারাদিন রোজা রেখে স্টলে কাজ করা কঠিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যারা অস্থায়ী কর্মী হিসেবে কাজ করেন তাদের জন্যও বিষয়টি অমানবিক।

এছাড়া ইফতার, তারাবি, যানজট—সব মিলিয়ে পাঠক সমাগম কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তোলা হয়। প্রকাশকদের মতে, এতে ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।

এক যৌথ বিবৃতিতে অন্যপ্রকাশ, বাতিঘর, ইউপিএল, পাঞ্জেরীসহ ৩২১টি প্রকাশনা সংস্থা মেলা বর্জনের ঘোষণা দেয়। ভাবুন একবার—গত বছর যেখানে ৫২৭টি প্রকাশনা সংস্থা অংশ নিয়েছিল, সেখানে অর্ধেকের বেশি না থাকলে কেমন দেখাবে মেলা?

নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। প্রকাশকদের সংগঠন ‘প্রকাশক ঐক্য’ নতুন প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি দেয়।

চিঠিতে তারা বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতায় প্রকাশনা শিল্প এমনিতেই চাপে আছে। এই অবস্থায় ভুল সিদ্ধান্ত পুরো শিল্পকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তারা তারিখ পিছিয়ে ঈদের পর মেলা আয়োজনের অনুরোধ জানান।

সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে বৈঠকের আয়োজন করা হয়। স্টল ভাড়া মওকুফের ঘোষণা দেওয়া হয় এবং প্রস্তুতির সুবিধার জন্য তারিখ ২০ থেকে পিছিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়।

সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল—হঠাৎ আবার নতুন সমস্যা। প্রকাশক ঐক্য অভিযোগ তোলে, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও কিছু প্রকাশককে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি ছিল, এ বছর কেউ আলাদা প্যাভিলিয়ন পাবে না; সবাই সমান ইউনিটের স্টল পাবে।

অভিযোগ ওঠে, বরাদ্দ প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ। এতে আবারও মেলা বর্জনের ঘোষণা আসে। পরিস্থিতি হয়ে ওঠে বিব্রতকর।

তবে বাংলা একাডেমি অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, নিয়ম মেনে আগেই আবেদনকারীদের প্যাভিলিয়ন দেওয়া হয়েছে। পরে আলোচনা করে সমাধানের পথ খোঁজা হয়। শেষ পর্যন্ত যেসব প্রকাশক প্যাভিলিয়ন পেয়েছিলেন, তারা সেটি ছেড়ে দিতে রাজি হন। ফলে সমতা নিশ্চিত করে সবার অংশগ্রহণের পথ তৈরি হয়।

২৬ ফেব্রুয়ারি মেলা উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটি তার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম বড় সরকারি অনুষ্ঠান। তাই প্রশাসন চায় না আয়োজন নিয়ে কোনো বিতর্ক বা বিশৃঙ্খলা থাকুক।

একই দিনে একুশে পদকপ্রাপ্তদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথাও রয়েছে। ফলে অনুষ্ঠানটি শুধু বইমেলা নয়, রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।

এই টানাপোড়েনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন লেখক ও পাঠকরা। লেখক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, আমাদের দেশে বই পড়ার মানুষ এমনিতেই কম। এর মধ্যে যদি বারবার তারিখ বদল, বর্জন আর বিতর্ক হয়, তাহলে পাঠকের আগ্রহ কমে যেতে পারে।

ভাবুন তো, আপনি যদি মেলায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, কিন্তু প্রতিদিন খবর বদলায়—হবে কি হবে না, কারা থাকবে কারা থাকবে না—তাহলে কি আগের মতো উৎসাহ থাকবে?

গত বছর বইমেলায় প্রায় ৪০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু এবার প্রকাশকদের আশঙ্কা, রোজা ও প্রস্তুতির স্বল্প সময়ের কারণে সেই অঙ্ক অর্ধেকেও নেমে আসতে পারে।

প্রকাশকরা বলছেন, যদি শেষ মুহূর্তে অংশ নিতেও হয়, প্রস্তুতি থাকবে অগোছালো। আবার ঈদের কেনাকাটা ও অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে পাঠক কম আসতে পারেন।

রাত পৌনে ১০টার দিকে জানা যায়, আলোচনার মাধ্যমে প্যাভিলিয়ন বিতর্কের সমাধান হয়েছে। প্রকাশকরা মেলায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে স্বস্তি ফিরেছে আয়োজকদের মধ্যে।

সব মিলিয়ে এবারের একুশে বইমেলা যেন শুধু বইয়ের উৎসব নয়—বরং প্রশাসন, প্রকাশক ও সরকারের সমন্বয়ের এক বড় পরীক্ষা।

শেষ কথা হলো, বইমেলা শুধু ব্যবসা নয়। এটা ভাষা, সংস্কৃতি আর আবেগের জায়গা। যত বিতর্কই হোক, শেষ পর্যন্ত যদি সবাই একসাথে বসে সমাধান খুঁজে নেয়, তবেই মেলার আসল উদ্দেশ্য সফল হবে।

এখন দেখার বিষয়—২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ পাঠকদের কতটা টানতে পারে। বইয়ের গন্ধ কি আবারও ফেব্রুয়ারির বাতাস ভরিয়ে তুলবে? সময়ই তার উত্তর দেবে।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন