Homeবিশেষ প্রতিবেদনতরুণ ভোটার ও নৌকার ভোট: কোন ফ্যাক্টর বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের নির্বাচন?

তরুণ ভোটার ও নৌকার ভোট: কোন ফ্যাক্টর বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের নির্বাচন?

Share

বাংলাদেশের সামনে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক আয়োজন নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক ও প্রজন্মগত মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত। দীর্ঘ সময় পর এমন একটি নির্বাচন আসছে, যেখানে বিপুলসংখ্যক নতুন ভোটার প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন। তরুণ ভোটার, নারী ভোটার, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং নৌকা সমর্থকদের ভোট—সব মিলিয়ে নির্বাচনের সমীকরণ এবার অনেক বেশি জটিল ও অনিশ্চিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেবেন। তার কথায়, “আমরা একটা নিরাপদ বাংলাদেশ চাই। নারী-পুরুষ সবার জন্য সমান অধিকার চাই।” এই অনুভূতি শুধু ফারজানার একার নয়। দেশের লাখ লাখ তরুণ ভোটারের মনের কথা প্রায় একই জায়গায় গিয়ে মিলে।

তরুণদের কাছে এবারের নির্বাচনের মূল ইস্যু নিরাপত্তা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্র সংস্কার। তারা চায় কথা বলার স্বাধীনতা বজায় থাকুক। চায় মেয়েরা রাস্তায়, ক্যাম্পাসে ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ থাকুক। সহজভাবে বললে, তারা এমন একটি দেশ চায় যেখানে ভয় না পেয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা যায়।

এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। বিগত তিনটি নির্বাচনে অনিয়ম ও একতরফা ভোটের অভিযোগ থাকায় অনেক তরুণ ভোট দিতে পারেননি। ফলে তাদের ভোটিং আচরণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা কারও নেই। এ কারণেই বিশ্লেষকরা বলছেন, তরুণ ভোটই হতে পারে জয়-পরাজয়ের প্রধান নিয়ামক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বেড়েছে। তারা শুধু দল দেখে ভোট দিতে চায় না। তারা দেখে কে কর্মসংস্থান তৈরি করবে, কে দুর্নীতি কমাবে, কে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের কথায়, “ঘুষ ছাড়া চাকরি চাই। ব্যবসা করতে চাইলে যেন সহজে ঋণ পাওয়া যায়।”

এই বাস্তব ও সরল চাহিদাগুলোই তরুণ ভোটারদের আলাদা করে তুলছে।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে তরুণরাই ছিল সামনে। তারা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে অনেক তরুণের মধ্যেই হতাশা আছে। তাদের মনে হয়েছে, কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।

ফারজানার ভাষায়, “রাষ্ট্রের ভেতর থেকে যে সংস্কার দরকার ছিল, সেটা হলো না।” এই হতাশা তরুণ ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। তারা হয়তো এবার আরও হিসেব করে ভোট দেবে।

বাংলাদেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী। তাই নারী ভোট উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে নারী ভোটারদের উপস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর। ভোটের দিন যদি সহিংসতার আশঙ্কা থাকে, তাহলে অনেক নারী ভোটকেন্দ্রে যেতে চাইবেন না। কেউ হেনস্তার শিকার হতে চায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ না হলে নারী ও সংখ্যালঘু ভোটাররা সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে পড়বে। সকালে ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার আহ্বান, প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মীদের মুখোমুখি অবস্থান—এসব বিষয় নারী ভোটারদের মধ্যে ভয় তৈরি করতে পারে।

ভোটের দিন কী ধরনের পরিস্থিতি থাকে, সেটাই অনেক সময় নির্বাচনকে প্রভাবিত করে। কোথাও সংঘর্ষ হলে তার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে অন্য এলাকার ভোটাররাও ভয় পেয়ে যেতে পারেন। বিশেষ করে নারীরা তখন ভোটকেন্দ্র এড়িয়ে চলেন।

এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এই ভয় আরও দ্রুত ছড়াতে পারে। কোথাও ছোট ঘটনা হলেও সেটাকে বড় করে দেখানো হতে পারে। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি শান্ত হলেও মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে।

এবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। কিন্তু তাদের সমর্থক ভোটব্যাংক পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। এই নৌকা সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যাবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।

বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক ভোট দিতে যাবেন। তবে তারা দল নয়, পরিস্থিতি দেখে ভোট দেবেন। তারা ভাবতে পারেন, কার কাছে গেলে কম ক্ষতি হবে। কোনো কোনো আসনে এই ভোটই জয়-পরাজয়ের ব্যবধান তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে যেখানে ভোটের ব্যবধান কম, সেখানে নৌকা সমর্থকদের ৫-১০ শতাংশ ভোট ফলাফল উল্টে দিতে পারে।

কিছু আসনে প্রবাসী ভোটারদের ভোটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যদি কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধানে আসন নির্ধারিত হয়, তাহলে প্রবাসী ভোট বড় ভূমিকা রাখবে। একইভাবে ঐতিহ্যবাহী দলীয় সমর্থকদের অতিরিক্ত কিছু ভোটই শেষ পর্যন্ত জয় নির্ধারণ করতে পারে।

এবারের নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহারও একটি প্রভাবক হতে পারে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকে প্রচারণা, অপপ্রচার, এমনকি এআই দিয়ে বানানো ভুয়া খবর ছড়ানোর আশঙ্কাও রয়েছে।

ভোটের দিন সহিংসতা না হলেও সহিংসতার গুজব ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রশ্ন হলো, এসব মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন কতটা প্রস্তুত।

সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন সবচেয়ে অনিশ্চিতগুলোর একটি। তরুণ ভোটারদের সংখ্যা বেশি, তাদের প্রত্যাশা বেশি, কিন্তু তাদের ভোটিং রেকর্ড নেই। নারী ভোটারদের ভূমিকা বড়, তবে নিরাপত্তা তাদের উপস্থিতি নির্ধারণ করবে। নৌকা সমর্থকদের ভোট নীরবে অনেক আসনে ফল বদলে দিতে পারে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরো প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।

এই সব ফ্যাক্টর মিলিয়েই এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের প্রশ্ন নয়, বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি বড় পরীক্ষা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন