আজকের দিনে স্মার্টফোন ছাড়া যেন আমাদের জীবন কল্পনাই করা যায় না। ঘুম থেকে উঠেই অনেকেই প্রথমে ফোন হাতে নেন, আবার রাত ঘুমানোর আগেও শেষ কাজ থাকে ফোন স্ক্রল করা। খবর পড়া, সোশ্যাল মিডিয়া দেখা, ভিডিও দেখা কিংবা কাজের প্রয়োজনে—সবকিছুতেই এখন স্মার্টফোন।
কিন্তু এই অভ্যাস যে শুধু চোখ বা ঘুমের ক্ষতি করছে তা নয়, গবেষণা বলছে স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার দাঁতের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। শুনতে অবাক লাগলেও বাস্তবে বিষয়টি বেশ গুরুতর। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনভর মোবাইল ব্যবহারের কারণে অনেকেই অজান্তেই এমন কিছু অভ্যাস তৈরি করেন যা দাঁত, চোয়াল এবং মাড়ির জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
নিচে সহজভাবে বুঝে নেওয়া যাক কীভাবে স্মার্টফোন ব্যবহার দাঁতের সমস্যা তৈরি করছে এবং কীভাবে এই ঝুঁকি থেকে নিজেকে বাঁচানো যায়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে দাঁতে দাঁত ঘষার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলা হয় “ব্রুকসিজম”।
এই সমস্যায় আক্রান্ত মানুষরা অনেক সময় ঘুমের মধ্যেই দাঁত চেপে রাখেন বা দাঁতে দাঁত ঘষেন। বিষয়টি অনেকেই বুঝতেও পারেন না। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এমন হলে দাঁতের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে এবং ধীরে ধীরে দাঁতের বাইরের শক্ত আবরণ, অর্থাৎ এনামেল ক্ষয়ে যেতে শুরু করে।
এনামেল নষ্ট হয়ে গেলে দাঁত দুর্বল হয়ে যায়। তখন সামান্য চাপেই দাঁত ফেটে যেতে পারে কিংবা ভেঙেও যেতে পারে।
আমরা যখন ফোন ব্যবহার করি, বেশিরভাগ সময় মাথা নিচু করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি। এই ভঙ্গিটি আমাদের শরীরের জন্য খুবই অস্বাস্থ্যকর।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাথা সামান্য নিচু করলেই ঘাড়ের ওপর চাপ অনেক বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ফোন স্ক্রল করার সময় ঘাড়ের ওপর প্রায় ২৫ থেকে ২৭ কেজি পর্যন্ত চাপ পড়তে পারে।
এই অতিরিক্ত চাপ শুধু ঘাড়ের ব্যথাই তৈরি করে না, ধীরে ধীরে চোয়ালের স্বাভাবিক অবস্থানও বদলে দিতে পারে। চোয়াল যদি স্বাভাবিক জায়গা থেকে সরে যায়, তখন দাঁতের বিন্যাসও এলোমেলো হয়ে যেতে পারে।
অনেকেই তখন বুঝতে পারেন দাঁত আগের মতো ঠিকভাবে বসছে না বা কামড়াতে অস্বস্তি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের মানসিক চাপও বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি সময় কাটানো, অতিরিক্ত তথ্যের চাপ, বা কাজের চাপ—সব মিলিয়ে মস্তিষ্ক সবসময় উত্তেজিত অবস্থায় থাকে।
এই মানসিক চাপ অনেক সময় ঘুমের মধ্যেও শরীরে প্রভাব ফেলে। তখন মানুষ অজান্তেই দাঁতে দাঁত ঘষতে শুরু করেন।
এভাবে প্রতিদিন দাঁতের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে কয়েকটি সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন—
দাঁতের এনামেল দ্রুত ক্ষয়ে যায়
দাঁতে ফাটল তৈরি হয়
দাঁত ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে
চোয়ালে ব্যথা শুরু হয়
অনেকে সকালে ঘুম থেকে উঠে চোয়ালে অস্বস্তি বা মাথাব্যথা অনুভব করেন। এর পেছনে অনেক সময় এই দাঁত ঘষার সমস্যাই দায়ী থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘ সময় ফোনে ডুবে থাকলে অনেকেই পানি পান করতে ভুলে যান। আবার ফোন ব্যবহারের সময় মুখও তুলনামূলক কম নড়ে।
ফলে মুখের ভেতরে লালা নিঃসরণ কমে যেতে পারে।
লালা আমাদের দাঁত ও মাড়ির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লালা মুখের ভেতরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণ করে এবং দাঁতকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
যখন লালা কমে যায়, তখন দাঁতে ক্যাভিটি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে মাড়ির সংক্রমণও দেখা দিতে পারে।
স্মার্টফোনের আরেকটি বড় সমস্যা হলো স্ক্রিনের নীল আলো। এই আলো আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন—মেলাটোনিনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়।
মেলাটোনিন মূলত ঘুম নিয়ন্ত্রণ করে। রাতে যদি ফোন বেশি ব্যবহার করা হয়, তাহলে শরীর ঠিকমতো এই হরমোন তৈরি করতে পারে না।
ফলে ঘুমের সমস্যা তৈরি হয়। ঘুম কম হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়। এর প্রভাব দাঁত ও মাড়ির স্বাস্থ্যেও পড়তে পারে।
অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারের কারণে কয়েকটি সাধারণ সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অনেক সময় চোয়ালে ব্যথা শুরু হয়।
মুখ খুলতে বা বন্ধ করতে অস্বস্তি হয়।
দাঁত সংবেদনশীল হয়ে যায়।
মাড়ি ফুলে যেতে পারে।
দীর্ঘদিন এসব সমস্যা চলতে থাকলে পরে ডেন্টিস্টের চিকিৎসা নিতে হতে পারে।
ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কয়েকটি সহজ অভ্যাস বদলালেই অনেকটা ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
প্রথমত, ফোন ব্যবহার করার সময় চেষ্টা করুন স্ক্রিন চোখের সমান উচ্চতায় রাখতে। এতে ঘাড় নিচু করতে হয় না এবং চোয়ালের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না।
দ্বিতীয়ত, একটানা অনেকক্ষণ ফোন ব্যবহার করবেন না। প্রতি ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর একটু বিরতি নিন। কয়েক মিনিট চোখ ও শরীরকে বিশ্রাম দিন।
তৃতীয়ত, দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করুন। এতে মুখে লালা নিঃসরণ স্বাভাবিক থাকে এবং দাঁতের সুরক্ষা বজায় থাকে।
চতুর্থত, ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ করার চেষ্টা করুন। এতে শরীর স্বাভাবিকভাবে মেলাটোনিন তৈরি করতে পারে এবং ভালো ঘুম হয়।
পঞ্চমত, দাঁত ও মাড়ির যত্ন নিন। প্রতিদিন অন্তত দুইবার দাঁত ব্রাশ করুন এবং নিয়মিত ডেন্টিস্টের পরামর্শ নিন।
স্মার্টফোন আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছে। কাজ, যোগাযোগ কিংবা বিনোদন—সবকিছুতেই এর ব্যবহার আছে। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যবহার যে শরীরের নানা সমস্যার কারণ হতে পারে, সেটাও মনে রাখা দরকার।
অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না ছোট ছোট অভ্যাস কীভাবে ধীরে ধীরে বড় সমস্যায় পরিণত হয়। তাই এখন থেকেই একটু সচেতন হওয়া জরুরি।
ফোন ব্যবহার করুন, কিন্তু সীমা মেনে। মাঝেমধ্যে ফোনটা পাশে রেখে শরীরকে বিশ্রাম দিন। এতে শুধু দাঁতই নয়, পুরো শরীরই ভালো থাকবে।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

