ছয় বছর বয়সী লামিয়া আক্তার জিনিয়ার চোখে মুখে খুশির ঝিলিক। তার একহাতে নতুন স্কুল ব্যাগ তো অন্যহাতে স্কুল ড্রেসের প্যাকেট। একটি চেয়ারে বসে একটু পর পর সেই লাল রঙের নতুন স্কুল ব্যাগটি নেড়েচেড়ে দেখছে। যেন আনন্দের সীমা নেই তার। পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন লামিয়ার মা নাজমা বেগম। তার হাতেও মেয়ের শিক্ষাবৃত্তির টাকার খাম। মেয়ের হাতে নতুন ব্যাগ আর স্কুল ড্রেস দেখে তিনিও আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে পড়েন।
যশোর শহরের বেজপাড়া আমতলার বাসিন্দা লামিয়ার বাবা নেই। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালায়। লামিয়া নতুন শ্রেণীর নতুন বই পেলেও ছিলো না তার স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ। বই পাওয়ার পর থেকেই লামিয়া তার মায়ের কাছে বায়না ধরেছিলেন নতুন ব্যাগ, স্কুল ড্রেসের। কিভাবে কিনে দিবে সেটা নিয়েও দুঃচিন্তায় ছিলেন নাজমা বেগম।
নাজমার দুঃচিন্তা দূর করে হাসি ফুঁটিয়েছেন আসাদ স্মৃতি ইন্সটিটিউশন। শুধু নাজমা বেগম নয়, তাদের মত শহরের হতদরিদ্র পরিবারের দুই শ’ শিশুর হাতে রঙিন দুই জোড়া করে নতুন স্কুল ড্রেস, একটি ব্যাগ ও স্কুলে ভর্তি হতে তুলে দেওয়া হয়েছে তিন হাজার টাকা।
শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১ টায় শহরের নলডাঙ্গা রোডস্থ রিপন রিপন অটোস প্রাইভেট লিমিটেডের মিলনায়তনে আসাদ স্মৃতি ইনস্টিটিউটের আয়োজনে সর্বজনীন শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়। বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এসব শিশুদের হাতে এসব শিক্ষা উপকরণ তুলে দেন। এতে প্রতিটি শিশু শিক্ষার্থীদের মুখে যেমন হাসি ফুঁটেছে; তেমনি উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরাও।
নাজমা বেগম বলেন, ‘তার স্বামী নাই। দুই মেয়েকে নিয়ে পরের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালায়। বড় মেয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। ছোট মেয়ে লামিয়া চতুর্থ শ্রেণীতে। দুই মেয়েকে স্কুল ড্রেস, ব্যাগ কিনে দেওয়ার সামর্থ্য নাই। তিনি মেয়ের নতুন পোশাক, ব্যাগ দেখে আনন্দিত হয়ে আয়োজকদের কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।’
৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার। তার বাবাও একজন শ্রমিক। অল্প আয়ে সংসার চলে না, সেখানে স্কুলের ইউনিফর্ম তাদের কাছে বিলাসিতা। এতদিন সে জরাজীর্ণ একটা পোশাকে স্কুলে আসত। নতুন ইউনিফর্ম পেয়ে ভীষণ খুশি সে। এবার থেকে প্রতিদিন সুন্দর ইউনিফর্ম পরে আসতে পারবে বলে তার আনন্দের সীমা নেই। তেমনিভাবে সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী স্বাগতা সেনের বাবা মুদি দোকানের বিক্রয় কর্মী। অভাবের সংসারে তার বাবার ইউনিফর্ম ব্যাগ কেনা সম্ভব হয় না। নতুন ইউনিফর্ম আর ব্যাগ পেয়ে উচ্ছ্বাসিত সে।
এ ধরণের অনুষ্ঠানে আসতে পেরে খুশি অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত । তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে এবং পড়ালেখায় আগ্রহ বাড়াতে এই সহায়তা সমাজের বৃত্তবানদের আরোও এগিয়ে আসা উচিত।
আমরা চাই, কেউ যেন শুধু অভাবে স্কুলছুট না হয়। এই উদ্যোগ মূলত রাষ্ঠের কাজ। তবে রাষ্ঠ্র যখন এসব উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ। তখন আসাদ স্মৃতি ইন্সটিটিউশনের মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসে। বিএনপি ক্ষমতায় আসলে সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে দেশটা নতুন করে গড়ে তুলবে বলে জানান তিনি।’
এদিকে,অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া ছিল ইতিবাচক। তারা জানান, শহরে অনেক পরিবারই দরিদ্র। স্কুল ব্যাগ বা শিক্ষা সামগ্রী কেনা অনেকের পক্ষে সম্ভব হয় না। এই উদ্যোগে তাদের সন্তানরা নতুন উদ্যমে স্কুলে যাবে এবং উপস্থিতিও বাড়বে।
অনুষ্ঠানে আসাদ স্মৃতি ইন্সটিটিউশনের সভাপতি এজাজ উদ্দিন টিপুর সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন যশোর নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এহসানুল হক সেতু, সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান মাছুম, ফারুক হোসেন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোস্তফা আমীর ফয়সাল, রিপন অটোস ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আসাদ স্মৃতি ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক আইয়াজ উদ্দীন রিপন, যশোর পৌর ৮ নাম্বার ওয়ার্ডের মহল্লা সুরক্ষা কমিটি আহ্বায়ক খান মোহাম্মদ শফিক রতন প্রমুখ।
আয়োজকরা জানান, ‘২০০৫ সাল থেকে আসাদ স্মৃতি সামাজিক কাজ করে আসছে। আসাদ স্মৃতি ইন্সটিটিউটের তত্ত্বাবধানে এখন পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি নারীকে ফ্রিতে কুরআন শিক্ষা, তিন শ’ নারীকে নারীকে সেলাই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। সেই সাথে সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিবছর বয়স্ক ভাতা হিসেবে ১৮ লাখ প্রদান করা হয়।
সেই ধারাবাহিকতায় এসব শিশুদের দুই সেট নতুন পোশাক, স্কুলে ভর্তির জন্য তিন হাজার করে টাকা ও একটা ভালো মানের স্কুল ব্যাগ দেওয়া হয়েছে।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

